মানুষ সাধারণ ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ডে ঝুঁকছে। তবে ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারে ওঠানামা লক্ষ্যে করা যায়। তবে দৈনন্দিন খরচ বৃদ্ধি, ইরান যুদ্ধ অস্থিরতার প্রভাবে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের চেয়ে দ্বিতীয় মাস ফেব্রুয়ারি মাসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে দেশের ভেতর, দেশের বাইরে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন কমেছে। ক্রেডিট কার্ডে দেশে-বিদেশে লেনদেন সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের তুলনায় ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের ভেতরও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন কমেছে। জানুয়ারি মাসে দেশের ভেতর খরচ হয়েছিল ৩ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। আর পরের ফেব্রুয়ারি মাসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে দেশের ভেতর খরচ হয়েছে ৩ হাজার ৪২২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে ফেব্রুয়ারি মাসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে দেশের ভেতর খরচ কম হয়েছে ২৯৮ কোটি টাকা।
খাত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দৈনন্দিন খরচ, বেতন-ভাতা গ্রহণ এবং নগদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কাছে এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম ক্রেডিট কার্ড। তুলনামূলকভাবে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা কম হলেও এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। আর শহর এলাকায় তা আরো বেশি হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মূলত শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যে ক্রেডিট কার্ড এখন একটি স্বাভাবিক ব্যয়ের মাধ্যম হয়ে উঠছে। একইভাবে প্রি-পেইড কার্ডের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছেÑগত পাঁচ বছরে যার প্রবৃদ্ধি ১৬ গুণ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিদেশে সবচেয়ে বেশি খরচ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটিতে বাংলাদেশিরা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে খরচ করেছে ৫৪ কোটি ৩ লাখ টাকা। এরপর থাইল্যান্ডে ৫০ কোটি ৪ লাখ টাকা, যুক্তরাজ্যে ৩০ কোটি ৪ লাখ টাকা, সিঙ্গাপুরে ৩২ কোটি ৪ লাখ টাকা, মালয়েশিয়ায় ২৩ কোটি টাকা, ভারতে ২৫ কোটি টাকা, নেদারল্যান্ডে ১৭ কোটি, সৌদিতে ২৮ কোটি, কানাডায় ১১ কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ কোটি, ইউএই ১৫ কোটি টাকা, আয়ারল্যান্ড ১৩ কোটি ও অন্যান্য দেশে ৫৭ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, নগদ বহনের চেয়ে মানুষ কার্ডে লেনদেনে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। বিদেশ ভ্রমণে এটি সবচেয়ে সহজ, নিরাপদ ও ঝুঁকিহীন পদ্ধতি। সাম্প্রতিক সময়ে চীনে যাত্রীপ্রবাহ রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছেÑতাই সে দেশে কার্ড ব্যয় বেড়েছে। তবে সম্প্রতি ইরাকে ইসরায়েলি হামলার প্রভাব এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে অনেকের ব্যয় সংকোচন করতে হয়েছে। তার একটা প্রভাব ক্রেডিট কার্ডে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদেশিরা বাংলাদেশে এসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে আগের চেয়ে কম খরচ করছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে বিদেশিরা বাংলাদেশে এসে খরচ করেছিল ৩৪৪ কোটি ৪ লাখ টাকা। আর ফেব্রুয়ারি মাসে বিদেশিরা বাংলাদেশে এসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে খরচ করেছে ২৬৬ কোটি ৬ লাখ টাকা। সেই হিসাবে জানুয়ারি মাসের তুলনায় ফেব্রুয়ারি মাসে বিদেশিরা বাংলাদেশে কম খরচ করেছে ৭৮ কোটি টাকা। আর বিদেশিদের খরচের দিক থেকে শীর্ষে আছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির নাগরিকেরা বাংলাদেশে খরচ করেছেন ৮৬ কোটি ৯ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা মোজাম্বিকের নাগরিকেরা ৩৫ কোটি টাকা খরচ করেছে। তৃতীয় অবস্থানের দেশ হিসাবে যুক্তরাজ্যের নাগরিকেরা ২৪ কোটি টাকা খরচ করেছেন। আর অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকেরা বাংলাদেশে এসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে খরচ করেছেন ৯ কোটি ৬ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, সামগ্রিকভাবে মানুষ নগদের চেয়ে কার্ডে লেনদেনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। আঞ্চলিক কূটনীতি ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের উন্নতিও ক্রস-বর্ডার কার্ড ব্যবহারে প্রভাব বেশ লক্ষণীয়। তবে সামগ্রিক দিক বিবেচনায় গত জানুয়ারির তুলনায় তার পরে মাস ফেব্রুয়ারিতে ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন কিছুটা কমেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে বিদেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশিরা ৪৬৩ কোটি টাকা খরচ করেছিল। আর ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশিরা বিদেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে খরচ করেছে ৩৭৭ কোটি টাকা। সেই হিসাবে জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারি মাসে বিদেশে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন কমেছে ৮৬ কোটি টাকা।
জানা গেছে, ব্যাংকগুলো সাধারণত পারচেজ কার্ড, মানি ট্রান্সফার কার্ড, রিওয়ার্ডস ওভারসিস কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড ও প্রি-পেইড কার্ড ও ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করে থাকে।