চট্টগ্রাম ব্যুরো
টানা কয়েক দিনের অতি ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার পর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং তিন পার্বত্য জেলা-রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হতে শুরু করেছে। বৃষ্টি কমে যাওয়ায় নদ-নদীর পানি নামছে এবং অধিকাংশ প্লাবিত এলাকা থেকে বন্যার পানি সরে যাচ্ছে। তবে পানি কমলেও দুর্ভোগ শেষ হয়নি। হাজারো পরিবার এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাজার হাজার বসতঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক, সেতু-কালভার্ট এবং কৃষিজমি। প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব নিরূপণ ও দুর্গত মানুষের পুনর্বাসন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কক্সবাজারে। এরপর চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাঁচ জেলার সম্মিলিত প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে অন্তত ৫৩ জনে। এর মধ্যে কক্সবাজারে ৩১ জন, চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন এবং রাঙামাটিতে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। কক্সবাজারে এখনো একজন নিখোঁজ রয়েছেন।
চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলা ও মহানগর বন্যাকবলিত
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ১৩ জুলাই সকাল ৯টার অতিবৃষ্টিজনিত দুর্যোগ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলার ১৫টি উপজেলা এবং চট্টগ্রাম মহানগরসহ মোট ১৭৬টি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শুধু সাতকানিয়া, বাঁশখালী বা লোহাগাড়াই নয়; আনোয়ারা, কর্ণফুলী, পটিয়া, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, সীতাকু-, মীরসরাই, সন্দ্বীপসহ জেলার প্রায় সর্বত্রই বন্যা বা জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরের বহদ্দারহাট, আগ্রাবাদ, হালিশহর, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, পতেঙ্গা ও খালপাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকাও কয়েকদিন পানির নিচে ছিল।
১৩ জনের মৃত্যু, ১৬ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে দুর্যোগে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং একজন নিখোঁজ রয়েছেন।
দুর্গত মানুষের জন্য ৪১৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে বর্তমানে ১৬ হাজার ৮২১ জন মানুষ অবস্থান করছেন।
জেলার ১৩ হাজার ৮৬০টি বসতবাড়ি, ৩৭৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রায় ১ হাজার ৩২০ কিলোমিটার সড়ক এবং ১৪৫টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া কৃষিজমি, মাছের ঘের, গবাদিপশু ও গ্রামীণ অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামে পানি কমছে
দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও বাঁশখালীতে বন্যার পানি দ্রুত নামছে।
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বায়েজীদ বিন আখন্দ জানিয়েছেন, বর্তমানে অধিকাংশ এলাকায় বন্যার পানি নেমে গেছে। কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতা রয়েছে।
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, পানি কমে যাওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
কক্সবাজারে সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতি
পাঁচ জেলার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি ছিল কক্সবাজারে। টানা বর্ষণ, পাহাড়ধস এবং বন্যায় ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৮ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা। আহত হয়েছেন ২৪ জন এবং একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
উখিয়া, টেকনাফ, রামু, ঈদগাঁও, চকরিয়া, পেকুয়া ও কক্সবাজার সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধস, নদীভাঙন এবং জলাবদ্ধতায় শত শত ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পাহাড়ধসে বহু আশ্রয়কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হাজারো রোহিঙ্গাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে।
কক্সবাজারে বর্তমানে ৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৪ হাজার ১৩১ জন মানুষ অবস্থান করছেন। জেলায় ৪৫০ মেট্রিক টন চাল ও ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬৩ মেট্রিক টন চাল এবং ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
বান্দরবানে পাহাড়ধসে প্রাণহানি
পার্বত্য জেলা বান্দরবানে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ধসে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, থানচি ও রুমা উপজেলার বিভিন্ন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ি ঢলে অনেক সেতু ও কালভার্ট ক্ষতির মুখে পড়েছে।
জেলার ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৫ হাজার ১৩৪ জন মানুষ অবস্থান করছেন। দুর্গত মানুষের জন্য ৪০০ মেট্রিক টন চাল ও ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৬৮ মেট্রিক টন চাল এবং ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকেও অতিরিক্ত ২০ লাখ টাকা বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
রাঙামাটিতে ধীরে ধীরে ফিরছে স্বাভাবিক অবস্থা
রাঙামাটিতে বন্যা ও পাহাড়ধসে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলার বিভিন্ন সড়ক, পাহাড়ি জনপদ ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে পানি কমতে শুরু করায় অধিকাংশ এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।
জেলার ৪৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ হাজার ৪৮৭ জন মানুষ অবস্থান করছেন। রাঙামাটির জন্য ৫০০ মেট্রিক টন চাল ও ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৯৫ মেট্রিক টন চাল এবং ২০ লাখ টাকা বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। এখানেও প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে অতিরিক্ত ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
খাগড়াছড়িতে পানি কমছে
খাগড়াছড়িতে বিভিন্ন নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। জেলার নি¤œাঞ্চলে এখনো কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা থাকলেও বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।
জেলায় ১৫০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হলেও বর্তমানে সেখানে মাত্র ৭৪ জন মানুষ অবস্থান করছেন। দুর্গত মানুষের জন্য ৪০০ মেট্রিক টন চাল ও ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত
চট্টগ্রাম জেলায় এ পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন চাল এবং ৬৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিভিন্ন উপজেলায় ৭৪০ মেট্রিক টন চাল এবং ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা মজুদ রয়েছে। ইতোমধ্যে ৪৬০ মেট্রিক টন চাল ও ৪১ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিবেচনায় এখনো ১ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন চাল, ৬০ লাখ টাকা এবং ৪ হাজার ৩৫০ বান্ডিল ঢেউটিন প্রয়োজন বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
পুনর্বাসনই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
পানি কমতে শুরু করলেও সংকট শেষ হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেতু সংস্কার, ঘরবাড়ি পুনর্র্নিমাণ, কৃষকদের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং জীবিকা পুনরুদ্ধার এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে স্বল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে। তাই শুধু ত্রাণ বিতরণ নয়, পাহাড়ধস প্রতিরোধ, নদী ও খাল পুনঃখনন, টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাধার সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলা করা কঠিন হবে।
পানি নামতে শুরু করায় মানুষ স্বস্তি পেলেও পাঁচ জেলার হাজারো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সামনে এখন নতুন লড়াই-ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, জীবিকা ফিরে পাওয়া এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সংগ্রাম।