জোরপূর্বক দোকান দখল এবং জুলাই শহীদের পিতাকে হেনস্তা ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগের পর এবার বাড়ি দখলচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সেলিম রেজার বিরুদ্ধে।
এছাড়াও অবৈধভাবে বালু বিক্রি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিবহনে তালা দিয়ে টাকা দাবি এবং চাকরি দেওয়ার নাম করে টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের ভুক্তভোগী কখনো সাধারণ মানুষ, আবার কখনো নিজ দলের নেতাকর্মীরাও।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ৩ মে সেলিম রেজার বিরুদ্ধে সাবেক সেক্রেটারি পরিচয়ে দোকান দখল এবং জুলাই শহীদের পিতাকে হেনস্তার অভিযোগের পর তাকে নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়। এরপর একে একে অর্থ আত্মসাৎ ও বাড়ি দখলের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। দেখা যায়, নিজ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতারাও তার প্রতারণা ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে চলাচলকারী ইলেকট্রিক কার্ট মালিককে মারধর এবং ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এই নেতার বিরুদ্ধে। একটি অডিও ক্লিপে দেখা যায়, ইলেকট্রিক কার্ট মালিক ইমনের কাছে টাকা দাবি করছেন অভিযুক্ত সেলিম রেজা। ফোনকলে তাকে বলতে শোনা যায়, “তুমি টাকা না দেওয়া পর্যন্ত গাড়ি আমার হেফাজতে থাকবে। বাবু, রাজু, নাহিদ, আসিফ—এই চারটি গাড়ির মেইনটেন্যান্স এখন থেকে আমার।”
একই ক্লিপে কার্ট মালিক ইমনকে বলতে শোনা যায়, “আপনি আমাকে ভাই ব্রেইন প্যারা দিয়ে যেভাবে মারছেন, সেভাবে মারতেছেন। এভাবে তো রাজনীতি চলে না। আপনার ভয়ে ড্রাইভাররা গাড়ি চালাচ্ছে না।”
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ইমন হাসান দৈনিক সংগ্রামকে জানান, তার কেনা ইলেকট্রিক কার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে পরিবহনসেবা দিয়ে আসছে। তিনি কয়েক বছর আগে এক ব্যক্তির কাছ থেকে সুদভিত্তিক ঋণ নিয়েছিলেন এবং গত ঈদ পর্যন্ত নিয়মিত সুদ পরিশোধও করেছেন। কিন্তু গত মাসে শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সেলিম রেজা তার কর্মীদের নিয়ে এসে নিজেকে ঋণদাতার আত্মীয় পরিচয় দিয়ে বাকি টাকা দাবি করেন এবং হুমকি দেন। একপর্যায়ে কার্ট আটকে রাখার কথাও বলেন।
এ ঘটনার কয়েকদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস ডিপোতে গিয়ে তিনটি কার্ট শেকলবদ্ধ করা হয় এবং দায়িত্বরত আনসার সদস্যদের হুমকি দিয়ে বলা হয়, তাদের অনুমতি ছাড়া যেন কেউ কার্ট বের করতে না পারে। এভাবে কার্ট আটকে রেখে একদিন সেলিম রেজা তার দলবলসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় কার্ট মালিক ইমন হাসানকে ডেকে ১৬ লাখ টাকা দাবি করেন। তর্ক-বিতর্কের একপর্যায়ে সেই দাবি কমিয়ে ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকায় নামানো হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ হাজার টাকা চাওয়া হয়। এরপর ভুক্তভোগী ইমনের কাছ থেকে জোরপূর্বক একটি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। কয়েকদিন পর সেলিম রেজার দলবল ইমনের বাড়িতে গিয়ে তাকে হুমকি, মারধর এবং তার স্ত্রীর সঙ্গে অসদাচরণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জাবি ছাত্রদলের সাবেক নেতা রুবেল পারভেজ দৈনিক সংগ্রামকে জানান, “সে নিজের বড় ভাইয়ের সঙ্গেও প্রতারণা করেছে। চাকরি দেওয়ার কথা বলে তার বড় ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা নিলেও চাকরি দেয়নি। আওয়ামী আমলে রাজনৈতিক কারণে আমি দেশের বাইরে ছিলাম। সেই সময় আমার বালুর ব্যবসা ও হোটেল দেখাশোনার দায়িত্বে ছিল সে। কিন্তু গত দুই বছরেও আমার বালু ও হোটেলের কোনো হিসাব বুঝিয়ে দেয়নি, বরং উল্টো দুই লাখ টাকা লভ্যাংশ দাবি করছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমার নেওয়া টেন্ডারের আওতায় সরকারি গুচ্ছগ্রামে দেওয়ার কথা থাকা প্রায় ১০০ গাড়ি বালু অবৈধভাবে অন্যত্র বিক্রি করেছে সে। গোপনে এসব বালু অন্য জায়গায় বিক্রি করে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছে। যার কারণে আমাকে ইউএনওর কাছে জবাবদিহি করতে হয়েছে।”
স্থানীয় আরেক ভুক্তভোগী, ঢাকা মহানগর পূর্ব ছাত্রদলের সহ-সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক মেহেদী হাসান শিউল দৈনিক সংগ্রামকে জানান, “সেলিম রেজা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আমার বোনের বাড়ি দখলের চেষ্টা করে। আমার বোনের জামাইয়ের বড় ভাই আমেরিকায় থাকেন, তার ভাড়াটে হয়ে বাড়ি দখল করতে আসে।”

ভিডিও ক্লিপে বাড়িওয়ালাকে হুমকি দিচ্ছে ছাত্রদল নেতা সেলিম রেজা
এ বিষয়ে সেলিম রেজা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে।” তবে বাড়ি দখলচেষ্টার পাঁচ মিনিট ৩২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও দৈনিক সংগ্রামের কাছে রয়েছে।
উল্লেখ্য, সেলিম রেজা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল নেতা এবং অস্ত্র ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত গালিব ইমতিয়াজ নাহিদের ছত্রছায়ায় এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন বলে জানা যায়। গত ৯ ফেব্রুয়ারি নাহিদ তিনটি বিদেশি পিস্তল, বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ যৌথ বাহিনীর অভিযানে আটক হন।