চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) পুলিশ কমিশনারের কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। গতকাল বুধবার ইসলামী ছাত্রশিবির কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্য এবং ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম এই স্মারকলিপি প্রদান করেন।

স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, গত মঙ্গলবার কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও তাদের সহযোগী বহিরাগতদের নেতৃত্বে পরিকল্পিত ও সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। এর আগে ‘জুলাই বিপ্লব’-এর শহীদদের স্মরণে টানানো ফেস্টুন ও আধিপত্যবিরোধী পোস্টার ছিঁড়ে ফেলার মাধ্যমে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে কলেজ প্রশাসনের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলে, পূর্বপরিকল্পিতভাবে শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়।

এতে অন্তত ১২ জন শিক্ষার্থী আহত হন। ঘটনার প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিল বের করা হলে পুনরায় দেশীয় অস্ত্রসহ হামলা চালানো হয়। দ্বিতীয় দফার হামলায় আরও প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী আহত হন, যাদের মধ্যে ৫ জনের অবস্থা গুরুতর। স্মারকলিপিতে দাবি করা হয়, হামলার সময় ছাত্রশিবিরের এক কর্মীর পায়ের গোড়ালি কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়েছে এবং তিনি আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এ ঘটনায় কলেজের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও শিক্ষকবৃন্দও হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়, যা স্মারকলিপিতে ‘চরম নিন্দনীয়’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া, বিক্ষোভ মিছিলের বিষয়ে আগেই সংশ্লিষ্ট থানাকে অবহিত করা হলেও হামলার সময় পুলিশ সদস্যদের নিষ্ক্রিয় ভূমিকার অভিযোগ তোলা হয়। এতে পরিস্থিতি আরও অবনতি ঘটে বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন ভূমিকা অপরাধীদের উৎসাহিত করেছে বলেও অভিযোগ করা হয় এবং বিষয়টি তদন্তের দাবি জানানো হয়।

স্মারকলিপিতে শিক্ষাঙ্গনে এ ধরনের সহিংসতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জ্ঞানচর্চা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার স্থান। সেখানে সন্ত্রাসী কর্মকা- জাতির ভবিষ্যতের ওপর আঘাত হানে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, যা কোনোভাবেই অবহেলা করা যায় না।

এ প্রেক্ষিতে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলো হলো- হামলার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেফতার, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা, দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা জোরদার, ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা।

স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম মহানগর দক্ষিণের প্রতিনিধি মাইমুনুল ইসলাম মামুন। সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন, বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

সিএমপি কমিশনার কার্যালয়ে স্মারকলিপি প্রদান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, “ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস নয়, গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।”

এর আগে মঙ্গলবার চট্টগ্রাম সিটি কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় আহতদের দেখতে হাসপাতালে যান সাদিক কায়েম।

সাদিক কায়েম অভিযোগ করেন, বহিরাগতদের নিয়ে এসে ধারালো অস্ত্র, হকিস্টিক ও দেশীয় অস্ত্র ব্যবহার করে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। এতে সংগঠনের ৩০ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে আশরাফুল নামে এক নেতা গুরুতর আহত হয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

হামলার সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার অভিযোগ, দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা নিষ্ক্রিয় ছিলেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

তিনি আরও জানান, হামলার সঙ্গে জড়িতদের ছবি, ভিডিও ফুটেজ ও বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একই সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার, স্বচ্ছ তদন্ত, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানানো হয়েছে। আহতদের পক্ষ থেকে মামলার প্রস্তুতিও চলছে বলে জানান তিনি।

ডাকসু ভিপি বলেন, “জুলাই-পরবর্তী সময়ে দেশের মানুষ একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু ক্যাম্পাসে সহিংসতা ও পেশিশক্তির রাজনীতি সেই প্রত্যাশাকে ব্যাহত করছে।”

তিনি জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে এবং প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ সময় ছাত্রশিবিরের অন্যান্য নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।