গ্রীষ্মকাল নিয়ে উদ্বেগ
মানুষের আশংকা ছিল পবিত্র রমযান মাসে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা পাবে কি না। কিন্ত মানুষের সেই শংকা সঠিক হয়নি। কারণ শংকার মধ্যেও পবিত্র রমযান মাস জুড়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা পেয়েছে মানুষ। বিশেষ করে ইফতারি,সেহরীর সময় বিদ্যুতের ে লোডশেডিং তেমন একটা হয়নি।
পবিত্র রমযান মাসে সেহরি, ইফতার ও তারাবির সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে ১৮ ফেব্রুয়ারি দুপুরে সচিবালয়ে তিনি এ নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পেয়ে বিদ্যুত বিভাগ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা দিতে নানা পরিকল্পনা নেয়। সেই মতে গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সেবা দিতে সক্ষম হন।
তবে পবিত্র রমযান মাস বিবেচনায় চলতি মার্চে বিশেষ প্রচেষ্টায় লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে রাখা গেলেও আগামী মাসে (এপ্রিল) গরম বাড়লে লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, এপ্রিলে গরম বাড়লে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়বে। কিন্তু উৎপাদন সেই অনুপাতে বাড়বে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
চলতি মাসে সার কারখানাসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক গ্রাহকের গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল রাখার পরও গত সপ্তাহে সময়ে সময়ে ঘণ্টায় প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মালিকদের সংগঠন বলছে, সরকার সময়মতো বকেয়া টাকা পরিশোধ না করায় বেসরকারি কেন্দ্রগুলো জ্বালানি আমদানি করতে পারেনি। তাই এপ্রিল-মে মাসে পরিস্থিতি কী হবে, তা বুঝতে পারছে না তারা।
বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুতের ঘণ্টাপ্রতি উৎপাদন ও বিতরণের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত শনিবার বিকেল ৪টায় ১৩ হাজার ৫০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ছিল ১২ হাজার ৫৪৬ মেগাওয়াট। এ সময় ৪৮১ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। বিদ্যুতের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ২৫৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এসেছে। তরল জ্বালানি থেকে এসেছে ৮৭৫ মেগাওয়াট।
মঙ্গলবার রাত ৯টার পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৪ হাজার ৯৬০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় ১৪ হাজার ৮৫৫ মেগাওয়াট। গত সপ্তাহে এটিই বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ও উৎপাদন। ওই সময় ১০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল।
বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম বলেন, অল্প লোডশেডিং হলেও মার্চজুড়ে বিদ্যুতের খুব বেশি ঘাটতি হবে না। ঈদের সময়ও সমস্যা হবে না। কারণ, এখন ১৫ হাজার মেগাওয়াট চাহিদা থাকলেও ঈদের ছুটিতে তা ১২ হাজার মেগাওয়াটে নেমে আসবে। তবে এপ্রিলের চিত্র কেমন হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে সৃষ্ট জ্বালানি-সংকটের প্রভাব তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পড়বে না জানিয়ে তিনি বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র চলে ফার্নেস অয়েলে। আগামী দুই মাস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর মতো ফার্নেস অয়েল দেশে মজুত রয়েছে। এর মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আর সমস্যায় পড়তে হবে না।
জহুরুল ইসলাম বলেন, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য সরকার আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে তেলের চাহিদা নিরূপণ ও আমদানি নিয়ে পিডিবি কাজ করছে। গ্যাসের সংকট থাকায় সার কারখানাগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। সরকার স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস সংগ্রহের চেষ্টা করছে।
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের সংগঠন বিপপার ভাইস প্রেসিডেন্ট নাভিদ হক বলেন, বিদ্যুৎ খাতের বড় সমস্যা হচ্ছে কেন্দ্রগুলো সরকারের কাছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা পাবে। এর মধ্যে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পাবে ১৪ হাজার কোটি টাকা। এই টাকা না পাওয়ায় কেন্দ্রগুলো জ্বালানি আমদানি করতে পারছে না। ঈদ উপলক্ষে সরকার বকেয়ার ৫ থেকে ১০ শতাংশ পরিশোধ করেছে। কিন্তু তা জ্বালানি আমদানির জন্য যথেষ্ট নয়। ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে। তাই সরকার এখন টাকা পরিশোধ করলেও তা দিয়ে জ্বালানি আমদানি দুরূহ হয়ে পড়বে। ফলে মার্চ ঠিকঠাকভাবে পার হলেও এপ্রিল-মে মাসে কী পরিস্থিতি হবে, তা বোঝা যাচ্ছে না।
জানা গেছে, রমযানে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নানামুখী উদ্যোগের নেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষিতে সরকারি-বেসরকারি অফিসে বিদ্যুতের ব্যবহার কমিয়ে সাশ্রয়ের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে, যার অর্থ এবারের গ্রীষ্ম এবং রমযান লোডশেডিংমুক্ত থাকছে না। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে এ সময় লোডশেডিং সহনীয় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের নানা বিষয়ে মাঠ প্রশাসনকে দেয়া হয় নির্দেশনা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায় , এ রমযানকে কেন্দ্র করে দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখা, সেইসঙ্গে সেহরি, ইফতার, তারাবির সময়টা যেন বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন থাকে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন স্বাভাবিক থাকে সে বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। পাশাপাশি সরকারের যে কমিটমেন্ট, বিশেষ করে নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন জায়গায় জনসভায় যে বিষয়গুলো বলেছেন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড সেগুলো নিয়েও তিনি আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন, আলোচনা করেছেন।
এদিকে রমযানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখার জন্য সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
মন্ত্রী বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি রমযানের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে। তবে এটি একটি কারিগরি বিষয়, মাঝেমধ্যে ছোটখাটো ত্রুটি বা ‘ফল্ট’ হতে পারে। তবে অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ ভালো থাকবে বলে আশা করছি।”
তিনি বলেন, রমযানের পর সামনে কৃষি ও সেচ মৌসুম এবং গ্রীষ্মকাল আসছে। বিদ্যমান সক্ষমতা দিয়ে প্রাণপণ চেষ্টা করা হবে যাতে কৃষি ও জনজীবনে বিদ্যুতের সংকট না হয়।
দায়িত্ব পালনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বিগত সময়ে যে পরিমাণ বকেয়া রেখে যাওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে যে পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করতে হবে, সব মিলিয়ে এটি আমার জন্য একটি কঠিন ‘অগ্নিপরীক্ষা’। আমি চেষ্টা করছি কীভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দিয়ে জনগণকে সুফল দেয়া যায় বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে পবিত্র রমযান মাস, গ্রীষ্মকাল ও সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে গ্রাহকদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুতের পরিমিত ও সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত ৭ নির্দেশনা :
এদিকে বিদ্যুতের পরিমিত ও সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে এক বার্তায় গ্রাহকদের জন্য সাতটি জরুরি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের ওই বার্তায় সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করে যে নির্দেশনাগুলো দেওয়া হয়েছে সেচ পাম্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে রাত ১১টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত পাম্প চালু রাখা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘ওয়েট অ্যান্ড ড্রাই’ পদ্ধতিতে সেচ কাজ সম্পাদন করা। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখা। বিদ্যুতের অপচয় রোধে দোকান, শপিং মল, পেট্রোল পাম্প ও সিএনজি স্টেশনে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা পরিহার করা। দুর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে হুকিং বা অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে বিরত থাকা। ইজি বাইক, অটোরিকশা ইত্যাদিতে অবৈধভাবে চার্জিং করা থেকে বিরত থাকা। পিক আওয়ারে (বিকেল ৫টা থেকে রাত ১১টা) এসি, ওয়েল্ডিং মেশিন, লন্ড্রি, ওভেন বা মাইক্রো ওভেন, হিটার, পানির পাম্প, ইস্ত্রি এবং বৈদ্যুতিক বিলবোর্ডসহ অধিক বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী সরঞ্জামাদির ব্যবহার বন্ধ রাখা।