মুহাম্মদ নূরে আলম: জুলাই গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পরোয়ানাভুক্ত ও মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ভারতে বসে দেশের বিরুদ্ধে একের পর এক ষড়যন্ত্রের ছক কষছেন। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মুখে গণভবন ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও তার দল নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং জুলাই বিপ্লবের অর্জনকে নস্যাৎ করতে লাগাতার রাষ্ট্রবিরোধী অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নির্বিচারে যে গণহত্যা চালানো হয়েছিল, তার সত্যতাকে ঢাকতে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তার আইনজীবীরা আন্তর্জাতিক মহলে বড় ধরনের অপপ্রচার অপচেষ্টা চালিয়েছিল এবং জাতিসংঘে দিয়েছিল চিঠি। কিন্তু জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং করে সেই চিঠির বক্তব্য নাকচ করে দেয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার এই তৎপরতা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর এক ধরনের নগ্ন হস্তক্ষেপ।
এদিকে ২৩ জুনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে আন্ডারগ্রাউন্ড সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই অপতৎপরতা আরও বাড়াতে পারে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানাগেছে। ভারত ও লন্ডনে অবস্থানরত নিষিদ্ধ ঘোষিত ও পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে একের পর এক গোপন বৈঠক, ভার্চুয়াল মাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান এবং আন্তর্জাতিক মহলে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার এক গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন শেখ হাসিনা। সূত্রে জানাযায়, পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে সরাসরি কোনো প্রকাশ্য বা আনুষ্ঠানিক ভিডিও কনফারেন্স প্ল্যাটফর্ম (যেমন জুম বা গুগল মিট) ব্যবহার করে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেননি। তবে আন্ডারগ্রাউন্ড সাংগঠনিক তৎপরতার অংশ হিসেবে এবং জুম বা অন্যান্য এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে তিনি প্রায় ডজনখানেক বা তার বেশি (১২টিরও বেশি) গোপন অডিও নির্দেশনা ও ফোনালাপ দিয়েছেন এবং এইসবের প্রমাণ পাওয়া যায় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দলীয় ফেইসবুক পেইজ ও অন্যান্য অওয়ামী সংশ্লিষ্ট উগ্র সন্ত্রাসী নেতাকর্মীদের দ্ধারা পরিচালিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে।
গোয়েন্দা ও নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ভারতের বিভিন্ন সেফ হাউজ এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডনে পলাতক আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে দফায় দফায় গোপন মিটিং অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই মিটিংগুলোতে স্বশরীরে উপস্থিত থাকতে না পারলেও শেখ হাসিনা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরাসরি যুক্ত হচ্ছেন। লন্ডনে অবস্থানরত তার দলের লবিস্ট এবং বাংলাদেশে লুকিয়ে থাকা আন্ডারগ্রাউন্ড সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সাথে ভার্চুয়াল মাধ্যমে যুক্ত হয়ে তিনি রাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন দিকনির্দেশনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান করছেন, যা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য চরম হুমকি।
আন্তর্জাতিক মহলে এবং ভারতের গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা লাগাতার দাবি করছেন যে বাংলাদেশ নাকি ‘পাকিস্তানি ভাবধারায়’ চলে গেছে এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধূলিসাৎ হচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্য বলছে, তার এই বক্তব্যের সাথে মিলিয়ে ২৩ জুনের আগে দেশের বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থান, ধর্মীয় উপাসনালয় বা মাজারগুলোতে পরিকল্পিত হামলা চালিয়ে তার দায় বর্তমান প্রশাসনের ওপর চাপানোর এক গভীর ব্লু-প্রিন্ট বা নীল-নকশা তৈরি করা হয়েছে।
গোয়েন্দা ও মাঠপর্যায়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাডার ও লবিস্টদের মাধ্যমে উসকানিমূলক বার্তা পাঠানো হচ্ছে এবং দেশের অভ্যন্তরে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা বা নাশকতার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আন্ডারগ্রাউন্ড সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অপতৎপরতা বৃদ্ধি করাই তাদের মূল লক্ষ্য। কলকাতায় গোপন বৈঠক ও ঢাকায় মিছিলের ছক পুলিশের কঠোর সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও পলাতক যুবলীগ-ছাত্রলীগের ক্যাডাররা ভারতের কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন। ৫ আগস্টের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যক্রম এবং ভার্চুয়াল উপস্থিতির একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার প্রায় ৬ থেকে ৮টি সুনির্দিষ্ট অডিও ক্লিপ ফাঁস হয়েছে, যেখানে দেশের অভ্যন্তরে থাকা তার অনুসারী ও নিষিদ্ধ সংগঠনের ক্যাডারদেরকে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র করে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালানোর উসকানি দিতে শোনা গেছে।
ফ্যাসিস্ট হাসিনার ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার: আগস্টের পর শেখ হাসিনা সরাসরি ক্যামেরার সামনে কোনো মুখোমুখি হয়ে সাক্ষাৎকার দেননি। ‘রয়টার্স’, ‘এএফপি’ এবং ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট’-এ তার যে বক্তব্যগুলো এসেছে, তা মূলত তার উপদেষ্টা, পরিবারের সদস্য (সজীব ওয়াজেদ জয়) অথবা লিখিত প্রশ্নোত্তর আদান-প্রদানের মাধ্যমে লবিং প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও বিবিসিতে লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমেও একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। আর ভারতের ত্রিপুরাভিত্তিক ‘যুগশঙ্খ’ এবং ২০২৬ সালের ১১ জুন পশ্চিমবঙ্গের প্রভাবশালী দৈনিক ‘এই সময়’ পত্রিকায় তার দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়।
বাংলাদেশ বিরোধী উসকানিমূলক বক্তব্য ও ‘পাকিস্তান কার্ড’ ব্যবহার করেন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। সম্প্রতি ভারতের গণমাধ্যম ‘এই সময়’-কে দেওয়া একটি দীর্ঘ ও বিতর্কিত একান্ত সাক্ষাৎকারে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরাসরি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে তীব্র বিষোদ্গার করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, বাংলাদেশ নাকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হারিয়ে ‘পাকিস্তানি ভাবধারায়’ ফিরে যাচ্ছে। সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, “স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখা আর পাকিস্তানি ভাবধারায় রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে নেওয়া, দুটো এক বিষয় নয়। আজ সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রভাব বাড়ানো এবং তরুণ প্রজন্মকে পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঠেলে দেওয়ার যে চেষ্টা চলছে; তার মধ্যে একটি গভীর রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে নাকি সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে রয়েছেন এবং পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর আঘাত আসছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করার একটি সুপরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার।
জুলাই গণহত্যা নিয়ে নিজেদের রিপোর্টে জাতিসংঘের অটল আস্থা ও ডুজারিকের জবাব: চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নির্বিচারে যে গণহত্যা চালানো হয়েছিল, তার সত্যতাকে ঢাকতে শেখ হাসিনা ও তার আইনজীবীরা আন্তর্জাতিক মহলে বড় ধরনের অপপ্রচার ও জালিয়াত করার চেষ্টা করেছিলেন। গত ২৮ মে ২০২৬ ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক আইনজীবী ও লন্ডনের ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্সের সদস্য আইনজীবী স্টিভেন পাওলস জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের কাছে চিঠি পাঠিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ভুল দাবি করেন এবং গেজেটের বরাতে সংখ্যাটি কমিয়ে প্রতিবেদনটি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। কিন্তু ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার এই শেষ রক্ষাকবচও টিকল না।
গত ১ জুন সোমবার জাতিসংঘের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে মহাসচিবের মুখপাত্র স্টেফান ডুজারিক এই বিষয়ে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আইনজীবীদের সমস্ত অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ডুজারিক স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, “প্রতিবেদন আমাদের মানবাধিকার দপ্তরের সহকর্মীরা প্রস্তুত করেছেন এবং আমরা এটি নিয়ে কোনো সন্দেহ পোষণ করি না। তা পুনর্বিবেচনা বা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা নেই।” এর মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার যে বর্বরতম গণহত্যা চালিয়েছিল, তার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর জাতিসংঘের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। কোনো খুনি বা ফ্যাসিস্টদের লবিস্টদের চিঠিতে জাতিসংঘের এই ঐতিহাসিক দলিল বিন্দুমাত্র নড়চড় হবে না।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানাযায়, পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার এই লাগাতার রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য ও রাজনৈতিক অপতৎপরতার বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, ভারতের মাটিতে বসে একজন গণহত্যাকারী ও পলাতক আসামীর এ ধরনের উসকানিমূলক রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান দুই দেশের বিদ্যমান কূটনৈতিক সম্পর্কের শর্ত ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন এবং নয়াদিল্লির সাউথ ব্লকে ইতিপূর্বেও এই বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখার জন্য ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা বলেন, একজন প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধী অন্য একটি দেশের মাটিতে বসে নিজ দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহী মনোভাব ছড়াতে পারেন না। ভারত যদি তাকে এভাবে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে দেয়, তবে তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রুলিংয়ের অবমাননা।
ব্রিটিশ ব্যারিস্টার ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন বিশ্লেষক ব্যারিস্টার বদরে আলম দিদার বলেন, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা এখন পুরোপুরি দেউলিয়া হয়ে ‘সংখ্যালঘু কার্ড’ ও ‘মৌলবাদ কার্ড’ খেলছেন, যাতে পশ্চিমা বিশ্ব ও ভারতের সহানুভূতি পাওয়া যায়। কিন্তু চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের চেতনা এতই সুদৃঢ় যে, এই ধরনের সস্তা প্রোপাগান্ডা বাংলাদেশের সচেতন নাগরিকরা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিকাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা এবং সচেতন ছাত্র-জনতা যেকোনো ধরনের ফ্যাসিবাদী নাশকতা রুখে দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আন্তর্জাতিকভাবে সম্পূর্ণ কোণঠাসা হয়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ এখন দেশীয় ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে ২৩ জুন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার অপচেষ্টা চালানোর চক্রান্ত করছে। তাই বাংলাদেশের জাগ্রত জনতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারির মুখে এই ফ্যাসিবাদী চক্রান্ত অচিরেই ধূলিসাৎ হতে বাধ্য।