২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে ইমাম হাসান তাইম হত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন পুলিশের বেতার কনস্টেবল নাহিদ মিয়া। জবানবন্দিতে তিনি জানিয়েছেন, আন্দোলন দমনে মাঠ পর্যায়ে থাকা পুলিশ সদস্যদের চাহিদা অনুযায়ী অস্ত্রাগার থেকে চায়নিজ রাইফেলের গুলী ও সিসা গুলী তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। জবানবন্দিতে নাহিদ মিয়া বলেন, ২০ জুলাই তিনি কানাঘুষায় জানতে পারেন, ১৯ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় ইন্সপেক্টর (তদন্ত) জাকির একজনকে গুলি করে হত্যা করেছেন। পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবে তিনি সেই ঘটনার ভিডিও দেখেন বলেও দাবি করেন। ওই ভিডিওতে জাকিরকে গুলী করতে দেখা গেছে। যে ছেলেকে গুলী করা হয়েছে তার নাম তাইম।

গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মামলার রাষ্ট্রপক্ষের ১২তম সাক্ষী হিসেবে নাহিদ মিয়া জবানবন্দি পেশ করেন। গণঅভ্যুত্থানের সময় থেকে এখন পর্যন্ত নাহিদ মিয়া যাত্রাবাড়ী থানায় বেতার অপারেটর হিসেবে কর্মরত। জবানবন্দিতে তিনি ২০২৪ সালের ১৮ ও ১৯ জুলাইয়ের কয়েকটি ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১০ মে দিন ঠিক করেছেন আদালত।

জবানবন্দিতে নাহিদ মিয়া বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সন্ধ্যায় তৎকালীন এসি (ডেমরা জোন) নাহিদ ফেরদৌস ওয়্যারলেসে সিসা গুলী চান। বিষয়টি তিনি তৎকালীন ওসি (যাত্রাবাড়ী থানা) আবুল হাসানকে জানালে লোকবলের অভাবে তাকে গুলী নিয়ে যেতে বলা হয়। নাহিদ মিয়া বলেন, ‘নিরুপায় হয়ে’ তিনি থানার সামনে থেকে ২০০টি সিসা গুলী এসি নাহিদ ফেরদৌসের কাছে পৌঁছে দেন।

পরদিন ১৯ জুলাইও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন নাহিদ মিয়া। ওই দিন যাত্রাবাড়ী মাছবাজার সংলগ্ন আউটগোয়িং ফ্লাইওভারে ডিউটিরত পার্টি কমান্ডার ব্রাভো ট্যাংগো-২৮২ (এসি ট্রাফিক ডেমরা) ওয়্যারলেসে চায়না রাইফেলের গুলি চান এবং মাছবাজার সংলগ্ন ইনকামিং ফ্লাইওভারে ডিউটিরত পার্টি কমান্ডার যাত্রাবাড়ী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির চায়না রাইফেলের গুলি চান।

নাহিদ মিয়া বলেন, বিষয়টি ওসিকে জানালে তিনি অস্ত্রাগার থেকে গুলি দিতে নির্দেশ দেন। নির্দেশ থাকায় তিনি অস্ত্রাগার থেকে ৪০০টি গুলী নেন। এর মধ্যে ৩০০টি পার্টি কমান্ডার ব্রাভো ট্যাংগো-২৮২ (এসি ট্রাফিক ডেমরা) ও ১০০টি ইন্সপেক্টর (তদন্ত) জাকিরের কাছে পৌঁছে দেন তিনি। গুলী নিয়ে যেতে দেরি হওয়ায় ওয়্যারলেসে পার্টি কমান্ডারদের অশোভন কথাবার্তার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন এই কনস্টেবল।

জবানবন্দিতে নাহিদ মিয়া বলেন, পরে ২০ জুলাই তিনি কানাঘুষায় জানতে পারেন, ১৯ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় ইন্সপেক্টর (তদন্ত) জাকির একজনকে গুলী করে হত্যা করেছেন। পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবে তিনি সেই ঘটনার ভিডিও দেখেন বলেও দাবি করেন। ওই ভিডিওতে জাকিরকে গুলি করতে দেখা গেছে। যে ছেলেকে গুলী করা হয়েছে তার নাম তাইম।

গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ইমাম হাসান তাইম রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের উপ-পরিদর্শক মো. ময়নাল হোসেন ভূঁইয়ার ছেলে। তাইম নারায়ণগঞ্জের সরকারি আদমজীনগর এমডব্লিউ কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। ইমাম হোসেন তাইম তার বন্ধুর সঙ্গে চায়ের দোকানে এসেছিলেন। সেখানে পুলিশ তাকে গুলী করলে আহত অবস্থায় তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল গুলীবিদ্ধ বন্ধু। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় মোট ১১ জনকে আসামী করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৯ জন পলাতক এবং দুজন কারাগারে।

পলাতক আসামীরা হলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপ-কমিশনার মো. ইকবাল হোসাইন, ডেমরা অঞ্চলের সাবেক উপ-কমিশনার মো. মাসুদুর রহমান, ওয়ারী অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার এস এম শামীম, সাবেক সহকারী কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, সাবেক পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জাকির হোসাইন, সাবেক পরিদর্শক (অপারেশন) মো. ওহিদুল হক ও সাবেক এসআই সাজ্জাদ উজ জামান।

কারাগারে থাকা দুই আসামি হলেন যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান ও সাবেক এসআই মো. শাহদাত আলী। গতকাল এই দুই আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

ঠিকানায় গিয়েও সন্ধান মেলেনি হাছান মাহমুদ-নওফেলসহ ১৭ জনের : চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন ছাত্রদল নেতা ওয়াসিমসহ ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদসহ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের আত্মসমর্পণে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ ও জহিরুল আমিন। ট্রাইব্যুনালকে ফারুক আহাম্মদ বলেন, এ মামলায় মোট আসামী ২২ জন। এর মধ্যে চারজন গ্রেপ্তার রয়েছেন। বাকি ১৮ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ছিল। কিন্তু স্থায়ী-অস্থায়ী ঠিকানায় গিয়ে তাদের খুঁজে পাননি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তবে একজন অন্য মামলায় গ্রেপ্তার থাকায় প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট চাই।

শুনানি শেষে ১৭ জনকে হাজির হতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া আরেকজনের বিরুদ্ধে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারি করা হয়।

এদিন সকালে কারাগার থেকে গ্রেপ্তার চারজনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন- চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক এমপি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, যুবলীগ নেতা আজিজুর রহমান, তৌহিদুল ইসলাম ও মো. ফিরোজ।

পলাতক অন্যরা হলেন- সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাসির উদ্দীন, রেজাউল করিম, মহিউদ্দিন বাচ্চু, হেলাল আকবর, নুরুল আজিম রনি, শৈবাল দাশ সুমন, আবু ছালেক, এসবারুল হক, এইচএম মিঠু, নূর মোস্তফা টিনু, দেবাশীষ পাল দেবু, জমির উদ্দিন, ইমরান হাসান মাহমুদ, জাকারিয়া দস্তগীর, মহিউদ্দিন ফরহাদ ও সুমন দে।

এর আগে, ৭ এপ্রিল তিন অভিযোগে ২২ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ নেন ট্রাইব্যুনাল-২। গত ৫ এপ্রিল ফরমাল চার্জ দাখিল করে প্রসিকিউশন।

প্রসিকিউশনের তিনটি অভিযোগ হলো- প্রথম অভিযোগে ওয়াসিম আকরাম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত ও মো. ফারুককে হত্যার দায় আনা হয়। দ্বিতীয় অভিযোগে তানভীর সিদ্দিকী, সায়মন ওরফে মাহিম ও হৃদয় চন্দ্রকে শহীদ করার দায় আনা হয়।

এছাড়া জাহিদ হাসান, আবদুল কাদের, আছিয়া খাতুন, সানজিদা সুলতানা, আবদুল্লাহসহ শতাধিক ছাত্র-জনতাকে গুরুতর আহত করার কথা উল্লেখ করা হয় তিন নম্বর অভিযোগে।