সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বাধীন ও পৃথক সচিবালয় তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে রায়ে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধান সুপ্রিম কোর্টের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ১৮৫ পৃষ্ঠার এ রায় প্রকাশ করেছেন।

রায়ে সরকারকে নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব অনুযায়ী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটি স্বাধীন ও পৃথক সচিবালয় আদেশের তারিখ হতে তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

রিটের পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, এই রায়ের ফলে নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকবে; রাষ্ট্রপতির ওপর নয়। আদালত পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন পূর্ণাঙ্গ রায়ে।

রায়ে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করেছেন হাইকোর্ট। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুসার, বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগে দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি দান, ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃংঙ্খলাবিধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকবে।

এর আগে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে রায় দেন হাইকোর্ট।

বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।

বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলাবিধান রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত। পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি তা প্রয়োগ করে থাকেন।

১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে, অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিষয় সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত ছিল।

১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়। পরে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ‘এবং পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা প্রযুক্ত হবে’ শব্দগুলো যুক্ত করা হয়।

১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৩৯ ধারা অনুসারে ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বাতিল করা হলো। একইভাবে ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনী আইনের ১৯ ধারার মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনও সাংঘর্ষিক বলে বাতিল করা হলো।

সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী ও ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ের নজির অনুসারে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ১১৬ অনুচ্ছেদ যেভাবে ছিল, সে রকম স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিভাইভ (পুনরুজ্জীবিত) ও সংবিধানে পুনর্বহাল হবে। এই আদালতের রায়ের দিন থেকে এটি কার্যকর হবে।

এ ছাড়া ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট।

এর আগে বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং বিচার বিভাগীয় পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা চেয়ে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাদ্দাম হোসেনসহ সাত আইনজীবী রিট করেন।

প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট ওই বছরের ২৭ অক্টোবর রুল দেন। রুলে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং এ-সংক্রান্ত ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়।

একই সঙ্গে বিচার বিভাগীয় পৃথক সচিবালয় কেন প্রতিষ্ঠা করা হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয় রুলে। আইন মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়।

রুলের শুনানি শেষে আদালত রায় ঘোষণা করেন।