• জামিন ও রিমান্ড নামঞ্জুর, আদালতে আইনজীবীদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগান

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গতকাল মঙ্গলবার ভোররাতে রাজধানীর ধানমন্ডির ৮/এ রোডের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, লালবাগ থানার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময়ের একটি হত্যাচেষ্টার মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, শিরীন শারমিনের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যা মামলাসহ ৬টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তিনটি মামলায় ইতিমধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। বাকি তিনটি মামলা বর্তমানে তদন্তাধীন।

এদিন দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটের দিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয় থেকে তাকে সিএমএম আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাকে আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। এরপর বেলা ৩টা ১০ মিনিটের দিকে পুলিশি বেষ্টনীতে তাকে এজলাসে তোলা হয়। জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে লালবাগ থানা এলাকায় আশরাফুল ওরফে ফাহিমকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় শিরীন শারমিন চৌধুরীর জামিন ও রিমান্ড নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। এর আগে লালবাগ থানায় হত্যাচেষ্টার মামলায় তার বিরুদ্ধে দুই দিনের রিমান্ড আবেদন করে ডিবি পুলিশ।

ভোরে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে চাচাতো ভাই আরিফ মাসুদ চৌধুরীর ধানমন্ডির বাসা থেকে আটকের পর রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সহিংসতার ঘটনায় দায়ের হওয়া তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রংপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে স্বর্ণশ্রমিক মুসলিম উদ্দিন (৩৮) নিহত হওয়ার ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট শিরীন শারমিন চৌধুরী, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন মুসলিম উদ্দিনের স্ত্রী দিলরুবা আক্তার (৩২)। হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন টিপু মুনশি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে বলেন, শিরীন শারমিন চৌধুরী রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কুশীলব ছিলেন, তিনি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এ মামলার পলাতকদের ব্যাপারে এড়িয়ে যায়। তাকে তদন্তের স্বার্থে ব্যপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে এজন্য ২ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হোক। রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, এ মামলায় শিরীন শারমিন ৩ নং আসামি। ২৪ এর আন্দোলন কোটাবিরোধী ছিল। যেখানে হাজার শিক্ষার্থী মারা যায়। শিরীন শারমিন চৌধুরী ফ্যাসিস্টের সহকারী ছিলেন। বিনা ভোটের এমপি ছিলেন। তিনি আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত। তিনি এজাহারনামীয় আসামি। এ মামলায় কারা জড়িত এবং আন্দোলনে কারা হত্যাকাণ্ড চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন তদন্ত স্বার্থে এসব জানা প্রয়োজন। এছাড়াও আরো সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়ার জন্য, গুলির নির্দেশদাতাদের বের করার জন্য তাকে দুই দিনের রিমান্ড দেওয়া হোক।

আসামিপক্ষের আইনজীবী রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন শুনানিতে ব্যরিস্টার মামুন বলেন, শিরীন শারমিন নিজে পদত্যাগ করেছেন তখন। এছাড়া আর কেউ পদত্যাগপত্র জমা দেননি। এজন্য উনি সবার মত না। তাকে এজাহারে ৩ নং আসামি দেখানো ছাড়া আর কোনো তথ্য কিন্তু অভিযোগে নেই। মামলায় ২৪ এর ১৮ জুলাইয়ের ঘটনা দেখিয়েছে। কিন্ত মামলা করেছে ২৫ এর মে মাসের ২৫ তারিখ। অর্থাৎ ১০মাস ৭ দিন পরে মামলা করেছে। উনি একজন আইনজীবীর পাশাপাশি ক্লিন ইমেজের মানুষ। এছাড়াও তিনি একজন নারী। এই বিবেচনায় তার রিমান্ড বাতিল করে জামিন দেওয়া হোক।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২৪ এর ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে আজিমপুর সরকারি কলোনির ভেতরে ছাত্র-জনতার একটি শান্তিপূর্ণ মিছিলে হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এবং মামলার অন্যান্য আসামিদের (ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রমুখ) পরিকল্পনা ও প্রত্যক্ষ মদদে এই হামলা চালানো হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, পুলিশের সদস্যসহ আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা দেশীয় ও বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করেন। এতে মো. আশরাফুল (ওরফে ফাহিম) নামের এক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। তার বাম চোখ ভেদ করে গুলি রেটিনার পেছনে চলে যায় এবং তিনি স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। ওই ঘটনায় ২৫ সালের ২৫ মে ভুক্তভোগী আশরাফুল বাদী হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ, শিরীন শারমিনসহ ১৩০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে একটি সিআর মামলা করেন। মামলার ৩ নম্বর আসামি হিসেবে শিরীন শারমিন চৌধুরীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা লালবাগ জোন ডিবির উপ-পরিদর্শক মোহসীন উদ্দিন বলেন, আসামি শিরীন শারমিন চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এবং তিনি জামিনে মুক্তি পেলে পলাতক হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় তাকে জেল হাজতে আটকে রাখা প্রয়োজন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে ছিলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। একই বছরের ২ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগ করেন তিনি। ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল স্পিকার নির্বাচিত হন শিরীন শারমিন। এরপর থেকে টানা তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি বিএনপিবিহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর শিরীন শারমিন চৌধুরীকে আবার স্পিকার নির্বাচিত করা হয়।

আদালতে আইনজীবীদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগান

গ্রেপ্তার সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর রিমান্ড ও জামিন উভয় আবেদন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর সময় আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা “জয় বাংলা” স্লোগান দিয়েছেন। দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালত থেকে পুলিশ শিরীন শারমিনকে কারাগারে নিয়ে যাওয়ার সময় তাকে ঘিরে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা “জয় বাংলা” স্লোগান দিতে থাকেন। এসময় তারা ‘শিরীন শারমিন ভয় নাই রাজপথ ছাড়িনাই’ বলেও স্লোগান দেয়।