ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা নেই বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। একই সাথে আওয়ামী লীগের করা আইনেই দলটির বিচার সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন চিফ প্রসিকিউটর।

আজ রবিবার (৫ জুলাই) নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব মন্তব্য করেন।

চিফ প্রসিকিউটর জানান, শেখ হাসিনার দেশে আসতে কোনো আইনি প্রতিবন্ধকতা নেই। বরং তিনি চান শেখ হাসিনা দেশে ফিরে তার বিরুদ্ধে হওয়া সাজা এবং অন্যান্য বিচারাধীন মামলার আইনি মোকাবিলা ও বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হোন।

মো. আমিনুল ইসলাম উল্লেখ করেন যে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে 'সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি' (Superior Responsibility) বা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায় থেকে শেখ হাসিনার সাজা হয়েছে, আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে নয়।

শেখ হাসিনার আপিল করার সুযোগ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, সাধারণত রায় ঘোষণার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে আপিলের বিধান রয়েছে এবং সেই সময় ইতিমধ্যে পার হয়ে গেছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমরা চাই তিনি দেশে ফিরে আসুন এবং আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হোন। তিনি দেশে ফিরলে আপিল ফাইলসহ অন্যান্য আইনি বিষয়গুলো তখন আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। অগ্রিম কোনো মন্তব্য করার সুযোগ নেই।

চিফ প্রসিকিউটর আরও জানান, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বর্তমানে অনেকগুলো মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। শাপলা চত্বর ঘটনাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্যান্য বেশ কিছু মামলায় তিনি বিচারের সম্মুখীন হতে পারেন। তাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তার দেশে ফিরে বিচার মোকাবিলা করা সমীচীন।

চিফ প্রসিকিউটর বিগত ১৬ বছরের শাসনামলে আওয়ামী লীগ দেশে ‘ফ্যাসিজম’ কায়েম করেছিল বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘বিগত তিনটি নির্বাচনে জনগণের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ বর্তমানে তদন্তাধীন এবং প্রতিবেদন পাওয়ার পর দলটির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মো. আমিনুল ইসলাম জানান, আওয়ামী লীগ সরকারই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন-১৯৭৩ এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯ প্রণয়ন করেছিল। তিনি বলেন, ‘২০১৩ সালে শেখ হাসিনার সরকার এই আইনে সংশোধনী এনে ‘অর্গানাইজেশন’ বা সংগঠন শব্দটি যুক্ত করেছিল।’ এই দুটি আইনেই দলটির কর্মকাণ্ডের বিচারের সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

চিফ প্রসিকিউটর আরও উল্লেখ করেন, ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মাধ্যমেও কোনো সংগঠনের অপরাধের বিচারের বিধান রয়েছে। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ১ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারই এই আইন ব্যবহার করে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করেছিল। সুতরাং, দল নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়াসহ সব ধরনের আইনি কাঠামো আওয়ামী লীগই তৈরি করে গেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সংবাদ সম্মেলনে হাসানুল হক ইনুর বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের অবস্থান স্পষ্ট করে চিফ প্রসিকিউটর জানান, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বর সংক্রান্ত মামলায় জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে আসামি করা হবে। তিনি বলেন, তথ্যপ্রমাণ অনুযায়ী তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হিসেবে তার নির্দেশনায় দুটি টেলিভিশন চ্যানেলের কার্যক্রম বন্ধ ও কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটেছিল। সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি নিজে এর দায় স্বীকার করেছিলেন, যা তদন্তে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

এছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্নাইপার রাইফেলের ব্যবহার সম্পর্কে মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, জুলাই বিপ্লব চলাকালে স্নাইপার রাইফেলের ব্যবহারের বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে। প্রাথমিকভাবে যাদের বিচারের সম্মুখীন করা হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে স্নাইপার ব্যবহারের অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া যাত্রাবাড়ীর একটি মামলায় দেখা গেছে, পুলিশের নামে ইস্যু করা অস্ত্রগুলো মূলত আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল, যা তারা নির্বিচারে ব্যবহার করেছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই অবস্থান বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়ায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং বিগত সময়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকে আরও গতিশীল করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।