জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেছেন, জুলাই সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ বাতিল এবং গণভোটের গণরায় বাতিল করার এই সিদ্ধান্ত বিএনপির সবচাইতে বড় রাজনৈতিক ভুল এবং আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বলে আমি মনে করি। এর ফলে জুলাই শহীদ এবং জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি অবমাননা করা হয়েছে। জন-আকাক্সক্ষাকে পদদলিত করা হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানকে অপমানিত করা হয়েছে। ৭০ ভাগ মানুষের গণরায়কে ইগনোর করার পরিণতি কখনো ভালো হতে পারে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও জন-আকাক্সক্ষাকে পদদলিত করার অর্থই হচ্ছে আরেকটি জুলাইকে স্বাগত জানানোর পথ তৈরি করা। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সূচনাকেই ব্যাহত করা।

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর দেয়া বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।

তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং জন-আকাক্সক্ষাকে পদদলিত করার অর্থই হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পার্লামেন্টারি স্বৈরতন্ত্র থেকেই ফ্যাসিবাদের নতুন ধারার সূচনা করা। আমরা চাইনি আজকের এই মহান সংসদে এই ধরনের আলোচনা করার জন্য। আমরা চেয়েছিলাম আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করেছি সংগ্রাম করেছি। সাড়ে ১৭ বছরে আমরা বাড়িতে ঘুমাতে পারিনি। আমাদের ১১ জন শীর্ষ নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সন্তানসহ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের গুম করা হয়েছে। ২০ হাজারেরও অধিক মিথ্যা মামলা দিয়ে আমাদের লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীকে ঘর-বাড়ি ছাড়া, অফিস ছাড়া, চাকরি ছাড়া, ব্যবসা ছাড়া করা হয়েছে। লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী কারাগারে বছরের পর বছর মানবেতর জীবনযাপন করেছেন।

তিনি আওয়ামী লীগের নির্যাতনের কথা স্মরণ করে বলেন, আমি নিজেও ১৫ বছর বাড়িতে ঘুমাতে পারিনি। ঢাকার বাসায়ও ১৫ বছর ঘুমাতে পারিনি। আমার ছোট ভাইকে গুম পর্যন্ত করা হয়েছিল ৪ মাস। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে ফিরে পেয়েছিলাম আমরা আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমরা ২০ হাজারেরও অধিক মিথ্যা মামলার মুখোমুখি হয়েছি। আমাদের কেন্দ্রীয় অফিস থেকে শুরু করে একটা ওয়ার্ড অফিস পর্যন্ত এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আমাদের প্রতিটি কর্মীর ওপরে জুলুম, নির্যাতন, নিষ্পেষণ, মিথ্যা মামলা, হুলিয়া, স্টিম রোলার চালানো হয়েছিল মাননীয় স্পিকার। স্বাভাবিকভাবেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আমরা চেয়েছিলাম যে আজকে অন্তত ঐক্যবদ্ধ হয়ে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য আমরা ভূমিকা পালন করব।

তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে কোন দলের কি ভূমিকা ছিল দেশের জনগণের কাছে তা পরিষ্কার। জুলাই আন্দোলনে এদেশের ছাত্রসমাজ এবং সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেছিলেন। সকল রাজনৈতিক দল তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী অংশগ্রহণ করেছিলেন। আমাদের এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও ১৮ই জুলাই জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলের পক্ষ থেকে একটি প্রেস কনফারেন্স করা হয়েছিল যেখানে কঠিন অবস্থার মধ্যে আমারও থাকার সুযোগ হয়েছিল। এই প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে সেইদিন আমরা জনগণের কাছে আহ্বান জানিয়েছিলাম জাতির এই ক্রান্তি লগ্নে দলমত নির্বিশেষে রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার জন্য সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে এবং সকল ধরনের তা-বতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এই পরিস্থিতিতে আপনারা জানেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমির বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা তিনি অবস্থান করছিলেন দেশের বাইরে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি দেশে ফিরে এসেছিলেন এবং আন্দোলনের জন্য যে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা এবং এগিয়ে নেওয়ার জন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। জুলাইর গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে ভূমিকা রাখার জন্যই সেইদিন আমিরে জামায়াত ফিরে এসেছিলেন, দেশে আসার কোনো পরিস্থিতি ছিল না। চলমান আন্দোলনকে নিয়ে কোনো ষড়যন্ত্র করার সুযোগ যেন না পায় সেইজন্য আমরা নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পরও আমরা সেইদিন রাজপথে অনড়, অটল এবং অবিচলভাবে আমরা ভূমিকা পালন করেছিলাম।

নূরুল ইসলাম বলেন, সেইদিন বিএনপির মহাসচিব আমার একান্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব গত ১৭ই জুলাই ২০২৪ সালে গায়েবানা জানাজা শেষে সাংবাদিকদের বলেছিলেন 'আমরা এই আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি কখনো জড়িত নাই তবে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের প্রতি আমাদের সমর্থন আছে'। জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংবিধানের কোনো ধারা মেনে হয়নি।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার জন্য সংবিধান সংশোধন করে এটিকে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে পরিণত করা হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, তাই যেদিন জনগণের সরকার ক্ষমতায় যাবে সেদিনই এই সংবিধান ছুড়ে ফেলে দেওয়া হবেÑএটি তার বক্তব্য ছিল। মাননীয় সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ তিনি ২৩ নভেম্বর ২০২৪, ‘যে সংবিধান মানুষের কথা বলে না, মানুষ সেই সংবিধান ছুড়ে ফেলে দেবে’Ñএই বক্তব্য তিনি দিয়েছিলেন। বিরোধী দলীয় মহাসচিব, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমার শ্রদ্ধাভাজন, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তিনি বলেছিলেন, ‘৭২-এর সংবিধান আওয়ামী লীগের সংবিধান। এটা জনগণের সংবিধান নয়, দেশের সংবিধান নয়।’ আজকে সেই সংবিধানের প্রতি আমাদের দরদ অনেক অনেক অনেক বেশি। প্রেসিডেন্টের একই আদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলো এবং গণভোট অনুষ্ঠিত হলো। জাতীয় সংসদ মানি, গণভোট মানি নাÑআমার তরকারি পছন্দ গোস্তটা আমি খাই ঝোলটা আমার পছন্দ না, এটা দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছু হতে পারে না মাননীয় স্পিকার।

তিনি বলেন, আজকে গণভোটের কথা বলা হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ৩০শে মে গণভোটের আয়োজন করেছিলেন। ১৯৭৮ সালে এটিকে সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। ৭৭ সালে গণভোট হয় যখন এটি সংবিধানে ছিল না। প্রেসিডেন্ট এরশাদ ১৯৮৫ সালের ২১শে মার্চ গণভোট আয়োজন করেছিলেন। তাহলে আজকের এই তৃতীয় গণভোট ৭০ পারসেন্ট মানুষের আশা আকাক্সক্ষা এবং ম্যান্ডেটকে অস্বীকার করা মানে হচ্ছে ১৮ কোটি মানুষকেই অস্বীকার করা।

তিনি আরো বলেন, যে পদ্ধতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদের বৈঠক আহ্বান করার জন্য ব্যবস্থা করেছিলেন, একই পদ্ধতিতে আমাদের দাবি ছিল, একই পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈঠক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডাকবেন। কিন্তু কোন কারণে উনি ডাকলেন না মাননীয় স্পিকার আমাদের বোধগম্য নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র জনতার আকাক্সক্ষা ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ চাই, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চাই, নিরাপদ এবং বসবাসযোগ্য বাংলাদেশ চাই, উই ওয়ান্ট জাস্টিসÑআমরা ন্যায় বিচার, আমরা ইনসাফ চাই। ‘দেশটা কারো বাপের না, দিল্লি না ঢাকা’Ñএই স্লোগানগুলো হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণকারী স্লোগান। সুতরাং আজকের বাংলাদেশ যদি এই স্লোগান, এই দৃষ্টিভঙ্গি, এই চেতনা এবং এই মূল্যবোধ থেকে ছিটকে পড়ে তাহলে মনে করতে হবে জুলাইর শহীদদের প্রতি আমরা যথাযথ সম্মান দিতে পারছি না।

নূরুল ইসলাম বলেন, সেই যে জুলাইর আকাক্সক্ষা সেটি বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান এবং রাষ্ট্র সংস্কার অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত ছিলÑএটি ছিল অপরিহার্য। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার জনগণের আকাক্সক্ষাকে পদদলিত করে জুলাই সনদ সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ বাতিল করেছে। সংশোধিত ব্যাংক রেজুলেশন বিল পাশ করে ইসলামী ব্যাংকসহ দেশের ব্যাংক ও অর্থ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংক ডাকাতদেরকে মালিকানায় ফিরিয়ে আনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ইসলামী ব্যাংক দখলের কোনো চক্রান্তই ব্যাংকের গ্রাহক এবং শেয়ার হোল্ডারগণ বাস্তবায়ন হতে দেবে না। মক করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে সরিয়ে একজন ঋণ খেলাপি এবং দলীয় ব্যবসায়ীকে গভর্নর হিসেবে বসানো হয়েছে। এই ধরনের গভর্নরের হাতে ব্যাংক আমানত এটা কখনোই নিরাপদ থাকতে পারে না। এটা দেশের জন্য লজ্জাজনক, এটা দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত।

তিনি বলেন, গুম খুন অধ্যাদেশ, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন সংস্কার কমিশন অধ্যাদেশসহ স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা অধ্যাদেশ, বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ সংসদে আলোচনা ছাড়াই ল্যাপস করে দেওয়া হয়েছে মাননীয় স্পিকার। সংবিধানের মূল নীতিমালাসহ কাঠামোগত সংস্কারের জন্য জনগণ যে মতামত দিয়েছিল, সেই ৭০ পারসেন্ট মতামতকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্র মেরামতের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হলো। এমতাবস্থায় ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা কতদিন অব্যাহত থাকবে আমরা জানি না। দেশের বর্তমান অবস্থা কি এটি পরিষ্কার।

বাংলাবাজারে বইয়ের দোকানে আগুন

হ স্টাফ রিপোর্টার

রাজধানীর পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বাংলাবাজারের একটি বইয়ের দোকানে অগ্নিকা- ঘটেছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট। অল্প সময়ের মধ্যেই আগুন নিয়ন্ত্রনে নেয় তারা। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটের দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়।

ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানায়, বাংলাবাজারের একটি বইয়ের দোকানে হঠাৎ আগুন লাগে। স্থানীয়রা প্রথমে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে ও ফায়ার সার্ভিসে খবর দেয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেয়।