শফিকুল ইসলাম, গোমস্তাপুর : বাংলার সুলতানি আমলের শৈল্পিক ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন
রাজশাহী বিভাগের নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলায় অবস্থিত সবুজ প্রকৃতির নিসর্গে দাঁড়িয়ে শতাব্দীর সাক্ষী হয়ে আছে কুসুম্বা মসজিদ। কালো পাথরে নির্মিত এই প্রাচীন স্থাপনাটি শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং বাংলার সুলতানি আমলের স্থাপত্যশৈলী, নান্দনিকতা এবং ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। সময়ের বিবর্তনে বহু স্থাপনা হারিয়ে গেলেও কুসুম্বা মসজিদ আজও আপন মহিমায় টিকে আছে—নীরবে জানিয়ে দিচ্ছে অতীতের গৌরবগাঁথা।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট
কুসুম্বা মসজিদ নির্মিত হয় ১৫৫৮-৫৯ খ্রিষ্টাব্দে, আফগান শাসক সুলাইমান খান কররানি-এর শাসনামলে। ঐতিহাসিক সূত্র মতে, মসজিদটির নির্মাণকাজ পরিচালনা করেন স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি সোলায়মান। সে সময় বাংলায় সুলতানি শাসনের শেষ পর্ব চলছিল, যেখানে প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এক ধরনের পরিপক্বতা লক্ষ করা যায়। এই মসজিদ সেই সময়কার স্থাপত্য-নৈপুণ্যের উজ্জ্বল নিদর্শন।
স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য
কুসুম্বা মসজিদকে অনেকেই “কালো পাথরের মসজিদ” নামে চেনেন। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো—কালো বেলেপাথরের ব্যবহার, যা বাংলার অন্যান্য মসজিদের তুলনায় একে ব্যতিক্রমী করেছে।
মসজিদটির স্থাপত্যে লক্ষণীয় কিছু দিকÑ
ছয় গম্বুজ বিশিষ্ট দৃঢ় কাঠামো
প্রায় দেড় থেকে দুই মিটার পুরু দেয়াল
সম্মুখভাগে তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ
অভ্যন্তরে কারুকার্যম-িত মিহরাব
দেয়ালজুড়ে জ্যামিতিক ও ফুলেল নকশা
এই নকশা ও অলংকরণে ফুটে উঠেছে তৎকালীন মুসলিম স্থাপত্যশিল্পের সূক্ষ্মতা ও শৈল্পিক রুচি। পাথরের গায়ে খোদাই করা অলংকরণ আজও দর্শনার্থীদের বিমোহিত করে।
প্রতœতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
কুসুম্বা মসজিদ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতœতাত্ত্বিক সম্পদগুলোর একটি। এটি বর্তমানে বাংলাদেশ প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর-এর অধীনে সংরক্ষিত। প্রতি বছর দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক এখানে আসেন, যা এ অঞ্চলের পর্যটন সম্ভাবনাকে সমৃদ্ধ করছে।
শুধু ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবেই নয়, এটি ইতিহাস-অনুসন্ধানী, স্থাপত্যপ্রেমী ও গবেষকদের কাছেও এক মূল্যবান ক্ষেত্র।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও সংরক্ষণ
শত শত বছর পেরিয়ে গেলেও কুসুম্বা মসজিদ তার স্থায়িত্ব ও সৌন্দর্য অনেকটাই ধরে রেখেছে। তবে প্রাকৃতিক ক্ষয়, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের সীমাবদ্ধতা এর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সচেতনতা এবং পর্যটকদের দায়িত্বশীল আচরণ অত্যন্ত জরুরি।
দর্শনার্থীদের চোখে
বর্তমানে ঈদ, ছুটির দিন কিংবা শীত মৌসুমে এখানে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ে। অনেকেই এই ঐতিহাসিক স্থাপনার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন, ইতিহাসকে কাছ থেকে অনুভব করেন। স্থানীয়দের মতে, যথাযথ প্রচার ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে এটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
উপসংহার
বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারক-বাহক হিসেবে কুসুম্বা মসজিদ এক অনন্য প্রতীক। এর প্রতিটি পাথর, প্রতিটি নকশা যেন অতীতের কথা বলে। এই ঐতিহ্য রক্ষা করা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, বরং আমাদের সবার সম্মিলিত কর্তব্য। কারণ, ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের শিকড়কে চিনতে পারবে।