নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো : চট্টগ্রাম মহানগর ও এর আশপাশের এলাকায় বর্ষা মৌসুম এলেই নতুন করে দেখা দেয় পাহাড় ধসের আতঙ্ক। টানা বৃষ্টি, পাহাড় কাটার অবাধ প্রবণতা এবং পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি-এই তিন কারণ মিলেই প্রতি বছর ঘটছে প্রাণহানির মর্মান্তিক ঘটনা। জেলা প্রশাসন প্রতি বছর বর্ষার আগে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি বসতি থেকে মানুষ সরিয়ে নিতে অভিযান চালালেও স্থায়ী সমাধানের অভাবে মৃত্যুর মিছিল থামছে না।

সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, গত ১৭ বছরে (২০০৭ থেকে ২০২৪) চট্টগ্রাম মহানগর ও আশপাশের এলাকায় পাহাড় ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ২৪৮ জন। এসব মৃত্যুর বেশিরভাগই ঘটেছে পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা অবৈধ বসতিতে।

প্রশাসন বলছে, এবারও বর্ষা সামনে রেখে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় মাইকিং, সতর্কীকরণ এবং উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর একই উদ্যোগ নেওয়া হলেও বর্ষা শেষে পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।

চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ২০০৭ সালের ১১ জুন। সেদিন টানা ভারী বর্ষণের পর ভয়াবহ পাহাড় ধসে একদিনেই ১২৭ জনের মৃত্যু হয়। নগরের লালখান বাজার, মতিঝর্ণা, কুসুমবাগ, আকবরশাহ ও খুলশী এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ি বসতিতে এই বিপর্যয় ঘটে।

সেই ঘটনার পর পাহাড় ধস রোধে নানা পরিকল্পনা নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি এবং অবৈধ দখলদারদের প্রভাবের কারণে পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০০৭ সালের সেই ট্র্যাজেডি প্রশাসনের জন্য বড় সতর্কবার্তা ছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কঠোর নজরদারির অভাবে ঝুঁকি এখনও বহাল রয়েছে।

পাহাড় ধসের ঘটনা শুধু অতীতের ভয়াবহ স্মৃতিই নয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও একইভাবে প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। ২০২২ সালের ১৭ জুন নগরের আকবরশাহ এলাকায় পাহাড় ধসে চারজন নিহত হন। টানা বর্ষণের মধ্যে গভীর রাতে এই দুর্ঘটনা ঘটে। ঘুমন্ত অবস্থায় মাটিচাপা পড়ে নিহত হন তারা।

২০২৩ সালের আগস্ট মাসে পাহাড় ধসে আরও দুইজনের মৃত্যু হয়। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হলেও যথাসময়ে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। এর আগে ২০১৭ সালে টানা বর্ষণে পাহাড় ধসে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ওই বছর রাঙ্গামাটি ও চট্টগ্রামজুড়ে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে, যা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের মতে, চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের অন্যতম প্রধান কারণ হলো অবাধে পাহাড় কাটা। আবাসন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সড়ক নির্মাণ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বছরের পর বছর ধরে পাহাড় কেটে ফেলা হচ্ছে।ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। টানা বৃষ্টিতে নরম মাটি সহজেই ধসে পড়ে নিচের বসতিগুলোর ওপর।

এ ছাড়া পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা বস্তি ও অস্থায়ী বসতিগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। নিম্নআয়ের মানুষ স্বল্প ভাড়ায় এসব এলাকায় বসবাস করায় ঝুঁকি জেনেও সরে যেতে চান না অনেকেই। স্থানীয়দের ভাষ্য, নিরাপদ বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা না থাকায় প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযানও দীর্ঘস্থায়ী ফল দেয় না।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন বলছে, পাহাড় ধসের ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বসতি থেকে মানুষ সরিয়ে নিতে ইতোমধ্যে মাইকিং শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও পাহাড় ব্যবস্থপনা কমিটির সদস্য সাখাওয়াত জামিল সৈকত বলেন, “দুই সপ্তাহ আগে এই বিষয়ে সভা হয়েছে। নগরীর কাট্টলী এলাকার এসিল্যান্ডসহ সবাইকে এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।”

তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি বসতিগুলো চিহ্নিত করে সেখানকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হচ্ছে। প্রয়োজনে আশ্রয়কেন্দ্রও প্রস্তুত রাখা হবে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জীবন রক্ষার স্বার্থে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। তবে বাস্তবে উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে অনেক সময় স্থানীয় প্রতিরোধ, রাজনৈতিক চাপ এবং পুনর্বাসনের অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র বর্ষার আগে মাইকিং বা সাময়িক উচ্ছেদ নয়-পাহাড় ধস রোধে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধ, ঝুঁকিপূর্ণ বসতির স্থায়ী পুনর্বাসন, পরিবেশ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং পাহাড় সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।

পরিবেশবিদদের মতে, চট্টগ্রামের পাহাড় শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অংশ নয়, এটি নগরের পরিবেশগত ভারসাম্যেরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই পাহাড় ধ্বংস হলে শুধু প্রাণহানিই নয়, ভবিষ্যতে আরও বড় পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

বর্ষা আবারও দরজায় কড়া নাড়ছে। পাহাড়ি জনপদের মানুষের মনে তাই নতুন করে ফিরে এসেছে আতঙ্ক-এবারও কি নামবে মৃত্যুর মিছিল, নাকি কার্যকর পদক্ষেপে রক্ষা পাবে জীবন।