কুষ্টিয়ার মিরপুরে এক ছাত্রীকে প্রায় ৮ ঘন্টা নিখোঁজের পর নিজ বিদ্যালয়ের একটি কক্ষ থেকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধারের সংবাদ পাওয়া গেছে। এ সময় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর হাত, পা ও মুখ বাঁধা ছিলো বলে জানা গেছে। ভুক্তভোগী ওই বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র এবং বিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী গ্রামের বাসিন্দা। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) রাত সাড়ে ৮ টার দিকে স্থানীয়রা কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার বারুইপাড়া ইউনিয়নের ছত্রগাছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৩য় তলার একটি কক্ষ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করেন।

জানা যায়,: কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ছত্রগাছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এসএসসি-২০২৬ ব্যাচের বিদায় অনুষ্ঠান ছিলো গতকাল বৃহস্পতিবার। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সকাল ৯ টার দিকে বিদ্যালয়ে যান। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষে অন্যান্য শিক্ষার্থীরা ফিরে গেলেও ফিরে যাননি ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী।

এতে পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করে। সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজার পর তাকে না পেয়ে রাতে বিদ্যালয়ের দপ্তরি হামিদুল ইসলামের কাছে যান পরিবারের সদস্যরা। দপ্তরি তাকে দেখেনি, এমনকি বিদ্যালয়ে কেউ নেই বলে পরিবারকে জানায়। এসময় পরিবারের সদস্যরা পুনরায় খুঁজে দেখার দাবি জানালে দপ্তরি অস্বীকৃতি জানায়।

এ সময় স্থানীয়রা খুঁজে দেখতে বিদ্যালয়ের চাবি চাইলে দপ্তরি দিতে রাজি হননি। পরে প্রধান শিক্ষকের হস্তক্ষেপে স্থানীয়রা চাবি নিয়ে গিয়ে বিদ্যালয় খুলে দেখেন তৃতীয় তলার একটি কক্ষে ভুক্তভোগী ওই ছাত্রী অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে। তার হাত ও পা বাঁধা এবং মুখে টেপ লাগানো। এরপর ভুক্তভোগী ছাত্রীকে উদ্ধার করে দ্রুত মিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করানো হয়। পরে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসাপাতালে রেফার্ড করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী ওই ছাত্রীর মামা নাজিম বলেন, আমি নিজে দপ্তরীর কাছে গিয়ে চাবি চাইলে দপ্তরী চাবি দিতে অস্বীকৃতি জানান। এ সময় দপ্তরির সাথে বাকবিতণ্ডা হয় এবং দপ্তরি আমাকে ধাক্কাধাক্কি করে বলেন, ‘তুমি কি আমার বাড়িতে মদ খেয়ে ঢুকেছো? পরবর্তীতে স্কুল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে কক্ষ খোলা হলে দেখা যায়, মেয়েটি স্কুলের ভেতরেই ছিল এবং সেখান থেকেই তাকে উদ্ধার করা হয়।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, উদ্ধারের সময় মেয়েটি অচেতন অবস্থায় ছিল এবং কথা বলতে পারছিল না। বর্তমানে সে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

আইনি পদক্ষেপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার ভাতিজা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেছিল। পরে পুলিশ এসে ঘটনাস্থলে তদন্ত করে গেছে।

ছত্রগাছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ খাইরুজ্জামান বলেন, গতকাল (বৃহস্পতিবার) বিদ্যালয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানটি শেষ হওয়া পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। অনুষ্ঠান শেষে তারা বাড়ী চলে যান।

সন্ধ্যার দিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী আমার বাড়িতে গিয়ে জানায়, একটি মেয়ে নিখোঁজ রয়েছে। তখন আমি তাদের বিদ্যালয়ে গিয়ে খোঁজ নেওয়ার জন্য দপ্তরির কাছ থেকে চাবি নিতে বলি। শিক্ষার্থীরা প্রথমবার খুঁজে না পেলেও পরবর্তীতে আবার খোঁজ করতে গিয়ে দপ্তরি ৩য় তলায় একটি স্থানে মেয়েটিকে দেখতে পায়। তখন সে কিছুটা বসা ও কিছুটা শোয়া অবস্থায় ছিল এবং তার জ্ঞান কিছুটা অস্পষ্ট মনে হচ্ছিল। খবর পেয়ে আমি নিজেও সেখানে যাই এবং মেয়েটিকে পাশের একটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একজন চিকিৎসক এসে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। পরে পরিবারের সদস্যরা এসে তাকে নিয়ে যান।

সিসিটিভি ফুটেজ সম্পর্কে তিনি বলেন, অনুষ্ঠানের সময় বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির কক্ষে অন্য কোনো শিক্ষার্থী ছিল না। ওই মেয়েটি একা প্রায় ৭-৮ মিনিটের জন্য কক্ষে প্রবেশ করে এবং পরে নিজের ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে যায়। এরপর সে ক্যামেরার বাইরে চলে যায় এবং তার পরবর্তী গতিবিধি আর দেখা যায়নি। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজে অন্য কাউকে ওই এলাকায় প্রবেশ করতে দেখেনি।

এছাড়াও রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বিষয়টি খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেছি, কিন্তু মেয়েটির বের হয়ে যাওয়ার পর আর কাউকে ক্যামেরায় ধরা পড়েনি। পরবর্তীতে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসেছে এবং দপ্তরির এলাকায় গিয়ে কিছু প্রাথমিক অনুসন্ধান ও কথাবার্তা বলেছে।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার মিরপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল আজিজ বলেন, ঘটনাটি সম্পর্কে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে মেয়েটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে জানায়, তাকে কেউ ধাক্কা দেয়নি এবং তার সঙ্গে অন্য কেউ কোনো কিছু করেনি। তবে সে প্রচণ্ড ব্যথার কথা জানিয়েছে। বিষয়টি চিকিৎসা-সংক্রান্ত কোনো কারণে হয়েছে কি-না, তা নিশ্চিত হতে তাকে রাতে সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে এখনো কোনো আপডেট পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ধর্ষণ বা এ ধরনের কোনো ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মেয়েটি কীভাবে পড়ে গিয়েছিল বা কী কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, সে বিষয়েও এখনো কিছু জানা যায়নি।