রাজশাহীর বিখ্যাত মিষ্টি পান বিদেশে রফতানির সম্ভাবনার আরো পথ খুলছে। এই সঙ্গে বিদেশের বাজারে এর চাহিদা বাড়ছে বলেও জানা গেছে। তবে পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং আধুনিক বাজারজাতকরণ সুবিধার অভাবও আছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী জেলায় দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে পানের আবাদ ও উৎপাদন। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কৃষকরা লাভজনক ফসল হিসেবে পান চাষে ঝুঁকছেন। বিশেষ করে বাগমারা, মোহনপুর, পবা, চারঘাট ও তানোর উপজেলায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য পানের বরজ। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহের পর এখন বিদেশেও রফতানি হচ্ছে রাজশাহীর পান। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজশাহী জেলায় প্রায় ৪ হাজার ৪৯৯ হেক্টর জমিতে পানের আবাদ হয়েছে। এসব বরজ থেকে উৎপাদিত হয়েছে প্রায় ৭৬ হাজার ১৫১ মেট্রিক টন পান। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আগামী কয়েক বছরে রাজশাহীর পান দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি কৃষিপণ্যে পরিণত হবে। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অনুকূল আবহাওয়া, উর্বর মাটি ও বাজারে ভালো দামের কারণে চলতি মৌসুমে পানের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অনেক কৃষক ধান ও অন্যান্য ফসলের পরিবর্তে পান চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। একটি বরজ থেকে সারা বছর পান সংগ্রহ করা যায় বলে কৃষকদের আয়ও তুলনামূলকভাবে বেশি হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, রাজশাহীর পান এখন দেশের বাজার ছাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, কুয়েত, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য ও ইতালি-এ প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে দেশীয় পানের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এছাড়া সীমিত আকারে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাতেও পান পাঠানো হচ্ছে বলে রফতানিকারকরা জানিয়েছেন। রফতানিকারকদের মতে, বিদেশে বসবাসরত দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে বাংলাদেশি ও ভারতীয়দের মধ্যে দেশীয় পানের জনপ্রিয়তা বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ধীরে ধীরে রাজশাহীর পানের আলাদা পরিচিতি তৈরি হচ্ছে। আধুনিক প্যাকেজিং ও দ্রুত পরিবহনের সুবিধা বাড়ায় রফতানি আরো সহজ হয়েছে। মোহনপুরের একজন পান চাষি জানান, তিনি আগে ধান চাষ করতেন। এখন পান চাষে অনেক বেশি লাভ হচ্ছে। দেশের বাইরে রফতানি হওয়ায় বাজারও ভালো পাওয়া যাচ্ছে। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পান চাষে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। রোগবালাই দমন, বরজ সংরক্ষণ, সেচ ব্যবস্থাপনা ও উন্নত জাতের পান চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিরাপদ উৎপাদন নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তবে উৎপাদন বাড়লেও কৃষকদের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অতিরিক্ত গরম, ঝড়-বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও বিভিন্ন রোগের কারণে অনেক সময় বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া পর্যাপ্ত হিমাগার, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও আধুনিক বাজারজাতকরণ সুবিধার অভাব রয়েছে। কৃষকরা বলছেন, সহজ শর্তে ঋণ ও সরকারি সহায়তা পেলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব হবে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, রপ্তানি ব্যবস্থাপনা আরও আধুনিক করা গেলে এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলে রাজশাহীর পান দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে। এতে কৃষকদের আয় বাড়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।