পদ্মার এপারের প্রায় সোয়া তিন কোটি মানুষের বক্ষ রোগের চিকিৎসার একমাত্র বাতিঘর খুলনা মহানগরীর মীরেরডাঙ্গায় অবস্থিত বক্ষব্যাধি হাসপাতাল। জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম। আবাসিক ভবনগুলো দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবসহ হাসপাতালে জনবল সংকট রয়েছে মারাত্মকভাবে। নতুন আঙ্গিকে হাসপাতালটিকে জেনারেল হাসপাতালে রূপান্তরের দাবি এলাকাবাসীর। জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল নির্বাচনপূর্ব গণসংযোগে একাধিকবার হাসপাতালটি জেনারেল হাসপাতালে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৫ সালে খানজাহান আলী থানাধীন মীরেরডাঙ্গা ভৈরব নদীর তীরবর্তী দুই দশমিক ৮৮ একর জায়গার উপর বিভাগীয় পর্যায়ে এ বক্ষব্যাধি হাসপাতালটি নির্মিত হয়। নির্মাণের পর ৬ দশক কেটে গেছে। দীর্ঘ সময় পার হলেও হাসপাতালটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিংবা বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসেবে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতকল্পে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন হয়নি। সেবার পরিধি বৃদ্ধিকল্পে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নেয়নি কোনো পদক্ষেপ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে উপেক্ষিত রয়েছে হাসপাতালটি।

বর্তমানে হাসপাতালটির বেহাল অবস্থা। জরাজীর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম। ভবনের ছাদ ফেটে রডগুলো বের হয়ে গেছে। বর্ষা মৌসুমে ভবনের ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ে। টেম্পার নষ্ট হওয়ায় ছাদের পলেস্তার প্রতিনিয়ত খসে পড়ছে। ভয়, আতঙ্ক এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ভর্তিকৃত রোগীরাও আতঙ্কের মধ্যে থাকে। বিশেষায়িত হাসপাতাল হলেও নেই কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, রেডিওলজি, প্যাথলজিস্ট চিকিৎসক। দু’জন সিনিয়র কনসালটেন্ট চিকিৎসকের পদ থাকলেও পাঁচ বছরের অধিক সময় ধরে পদ দু’টির বিপরীতে কোনো নিয়োগ হয়নি। চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ৭ জন। তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংকট রয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে নেই কোনো পরিচ্ছন্ন কর্মী, আয়া এবং পিয়ন। ৪৫ পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২০ জন। আউটসোর্সিংয়ে কর্মরত আছেন ১২ জন। হাসপাতালটি সুরক্ষিত না হওয়ায় অবাধে মানুষ এবং গরু-ছাগল প্রবেশ করে। সন্ধ্যার পর পরিত্যক্ত আবাসিক ভবন গুলোতে মাদকসেবীদের আনাগোনা বৃদ্ধি পায়। মাঝেমধ্যে চুরি হয় হাসপাতালের মূল্যবান জিনিসপত্র। কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্সদের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করার অভিযোগ রয়েছে। খাবারের গুণগত মান নিয়েও রোগীদের অভিযোগ রয়েছে। ওয়ার্ডে ভর্তিকৃত রোগীদের টয়লেটগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মুহম্মদ এমরান হোসেন বলেন, ‘জরাজীর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ভয়, আতঙ্ক এবং ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করছি। সবগুলো আবাসিক ভবন পরিত্যক্ত। ভবনের দুরবস্থার কথা জানিয়ে বহুবার কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে। খুলনা গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে পুরানো ভবন অপসারণপূর্বক নতুন ভবন নির্মাণের প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। একনেকে উত্থাপিত হয়েছিল, কিন্তু যথাযথ তদবিরের অভাবে অনুমোদন পায়নি।’ তিনি বলেন, ‘খুলনা এবং বরিশাল বিভাগের একমাত্র রিজিওনাল রেফারেন্স ল্যাবরেটরি (পরীক্ষাগার) এ হাসপাতালটিতে রয়েছে। যেটি হাসপাতালের জন্য খুবই ইতিবাচক দিক। ঝুকিপূর্ণ ভবনের কারণে ভর্তি রোগীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তবে বহির্বিভাগে প্রতিদিন শতাধিক রোগীকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়ে থাকে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এটি জেনারেল হাসপাতালে রূপান্তরিত হতে পারে। সেক্ষেত্রে সেবা বহুলাংশে বিস্তৃতি লাভ করবে। পাশাপাশি এলাকার আর্ত্মসামাজিক উন্নয়ন হবে। খানজাহান আলী দৌলতপুর থানার অধিবাসীসহ, পার্শ্ববর্তী ভৈরব নদীর ওপর প্রান্ত দিঘলিয়া এবং ফুলতলা উপজেলার অসংখ্য মানুষ চিকিৎসার সব ধরনের সেবা পাবে। জেনারেল হাসপাতাল হিসেবে রূপান্তরিত হলেও টিবি রোগীদের জন্য আলাদা ব্লক রাখা যাবে।’ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এলাকাবাসীর দাবি জরাজীর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ এবং পরিত্যক্ত ভবনগুলো অপসারণ করে নতুন ভবন তৈরির মাধ্যমে হাসপাতালটিকে জেনারেল হাসপাতালে রূপান্তরিত করা হোক। অসংখ্য মানুষের বসবাস হলেও এ এলাকায় কোনো জেনারেল হাসপাতাল নেই। সরকারি চিকিৎসা সেবা নিতে এলাকার মানুষের একমাত্র ভরসা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। কিন্তু সেখানেও রোগীরা কাক্সিক্ষত সেবা পায় না। হাসপাতালটি জেনারেল হাসপাতালে রূপান্তরিত হলে এ এলাকার বহু মানুষের সব ধরনের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত হবে।