সারিয়াকান্দি (বগুড়া) সংবাদদাতা : কাগজে-কলমে চলছে সরকারি লোকবল দিয়ে ‘খাস আদায়’। কিন্তু বাস্তবে তদারকির অভাব আর ইজারাদারদের অলিখিত বয়কটে বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ হাটে রাজস্ব আদায়ে স্বেচ্ছাচারিতা চলছে। সরকারি নির্ধারিত মূল্যে কোনো ইজারাদার দরপত্র দাখিল না করায় চলতি ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে সরকারের প্রায় ৫০ লাখ টাকার রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিগত বছরের তুলনায় টোল আদায় এতটাই তলানিতে ঠেকেছে যে, একে নামমাত্র অর্থ সংগ্রহ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মথুরাপাড়া, জোড়গাছা এবং দেবডাঙ্গা হাট-বাজার প্রতি বছর ভালো মূল্যে ইজারা হলেও গত বছর থেকে জোড়গাছা এবং এ বছর বাকি দুটি হাটের চেনা দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে গেছে। প্রশাসনের অনড় অবস্থান আর ইজারাদারদের অনাগ্রহের সুযোগে একশ্রেণির আদায়কারী ইচ্ছামতো অর্থ পকেটে পুরছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কুতুবপুর ইউনিয়নের মথুরাপাড়া হাটটি ১৪৩২ বঙ্গাব্দে ভ্যাট-ট্যাক্সসহ ২৩ লাখ ৪৪ হাজার ২১৮ টাকা ৭৫ পয়সায় ইজারা নিয়েছিলেন সোহেল রানা নামের এক ব্যক্তি। অথচ চলতি ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের শুরুতে এই হাটের দরপত্রে কেউ অংশই নেয়নি। বৈশাখ মাসের খাস আদায়ের চিত্র বলছে, বছর শেষে এই হাট থেকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাবে।

সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের জোড়গাছা হাটের। ১৪৩১ বঙ্গাব্দে এই হাটের ইজারা মূল্য ছিল ভ্যাট-ট্যাক্সসহ ২৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা। চড়া মূল্যের অজুহাতে এরপর টানা দুই বছর কোনো ইজারাদার দরপত্র কেনেনি। ফলে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের মাধ্যমে খাস আদায় চলছে। সরকারি কাগজে দেখা গেছে, ১৪৩২ সনে এই হাটে মোট খাস কালেকশন হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৬০ হাজার ৭৩২ টাকা! অর্থাৎ, ইজারা না হওয়ায় শুধু এই এক বাজার থেকেই সরকারের এক বছরের লোকসান প্রায় ২৫ লাখ টাকা। একই চিত্র দেবডাঙ্গা হাটেও; গত বছর ২ লাখ ৬৫ হাজার টাকায় ইজারা হওয়া এই বাজারে এবার খাস আদায়ের নামে নামমাত্র টাকা সরকারি কোষাগারে জমা পড়ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী ও ইজারাদার জানান, হাটের ইজারা মূল্য প্রতি বছর যেভাবে অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হয়, বর্তমান বাজারের পরিস্থিতি তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মথুরাপাড়া হাটের ব্যবসায়ীরা জানান, এই হাটটি মূলত শুকনো মরিচ ও কোরবানির পশুর মৌসুম নির্ভর। বছরের বাকি সময় বেচাকেনা কম থাকায় চড়া মূল্যে ইজারা নিলে নিশ্চিত লোকসান। তাদের দাবি, “ব্যক্তি মালিকানায় ইজারা হলে উসুল তোলার জন্য তদারকি থাকে, লাভও হয়। আর সরকারি কালেকশনে যে যা দেয় তা-ই নেওয়া হয়, কোনো জবাবদিহিতা নেই।

অন্যদিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা আঙুল তুলছেন অব্যবস্থাপনার দিকে। কর্নিবাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন দীপন বলেন, নদী পথে নাব্যতা সংকটের কারণে হাটে বাইরের ক্রেতা-বিক্রেতা ও পণ্য আসা কমে গেছে। নদী খনন করে চ্যানেল তৈরি না করলে হাটের জৌলুস ফিরবে না।”

ভেলাবাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান শিপন মিয়ার অভিযোগ আরও গুরুতর। তিনি বলেন, “সরকার যে জায়গা নির্ধারণ করে হাট ইজারা দেয়, বাস্তবে সেখানে হাটই বসে না। হাট বসে স্থানীয় বিদ্যালয় মাঠসহ বিভিন্ন যত্রতত্র জায়গায়। বিশেষ করে কোরবানির ঈদে প্রশাসনের নাকের ডগায় অবৈধ পশুর হাট বসে। মূল বাজারে বেচাকেনা না হলে মহালদাররা কেন কোটি টাকা খাটিয়ে নিলামে অংশ নেবেন?” কুতুবপুর ইউপি চেয়ারম্যান সুজন একে নজিরবিহীন উল্লেখ করে বলেন, সারিয়াকান্দির ইতিহাসে এর আগে কখনো হাটের ডাক এভাবে পুরোপুরি বন্ধ থাকেনি।

খাস কালেকশনের দায়িত্বে থাকা কুতুবপুর, কর্নিবাড়ি ও ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের তহশিলদাররা (ভূমি কর্মকর্তা) মাঠের নাজুক অবস্থার কথা স্বীকার করলেও আদায়ের সুনির্দিষ্ট হিসাব দিতে রাজি হননি। তারা বিষয়টিকে ‘উপজেলার তথ্য’ বলে এড়িয়ে যান এবং গত বছরের চেয়ে বেশি আদায়ের চেষ্টা করছেন বলে দাবি করেন।

সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমাইয়া ফেরদৌস বলেন, নিয়ম অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম মূল্যে ইজারাদারদের নিলাম দেওয়া সম্ভব নয়। সে কারণেই নিলাম প্রক্রিয়া সচল রাখার পাশাপাশি খাস আদায় করা হচ্ছে। তবে রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে এবার বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।”

সচেতন মহল মনে করছেন, কেবল ‘মনিটরিং’-এর আশ্বাস দিয়ে এই বিশাল রাজস্ব ঘাটতি ঠেকানো সম্ভব নয়। ইজারা মূল্যকে বাস্তবসম্মত করা, যত্রতত্র বসা অবৈধ হাট উচ্ছেদ করা এবং খাস আদায়ের ডিজিটাল বা স্বচ্ছ তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে সারিয়াকান্দি উপজেলার রাজস্ব খাত আরও বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বে।