লাগাতার বৃষ্টিপাত আর জলাবদ্ধতায় সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর বোরো জমি প্লাবিত হয়েছে। যেসকল উচু এলাকায় ধান কাটা সম্ভব হয়েছে তাও রোদের অভাবে শুকনো যাচ্ছে না। বৈশাখ শুরুর থেকেই সুনামগঞ্জের আকাশে রোদের দেখা মিলছে না। ফলে মাড়াইকৃত ধানে পচন ধরেছে। ফলে সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ে নিদারুণ হতাশা দেখা দিয়েছে।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী এবার জেলায় মোট ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৭৩ হেক্টর জমির ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। জেলার হাওরাঞ্চলে ধান কাটার হার ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৯৩ হেক্টর, যা মোট হাওরে আবাদকৃত জমির ৭৭.২৬১ শতাংশ। অন্যদিকে নন-হাওর এলাকায় ধান কাটা হয়েছে ১৯ হাজার ৬৮০ হেক্টর, যার হার ৩৩.৭৯৪ শতাংশ।
সোমবার (৩ রা মে) ১১ টায় জেলা প্রশাসন জানিয়েছে এ জেলায় এখন পর্যন্ত মোট ২০ হাজার ১৬০ হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে, যা মোট আবাদি জমির ৯.০১৯ শতাংশ। এরমধ্যে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৪৭ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে চতুর্থ পর্যায়ে ২৭ এপ্রিল থেকে ৩ মে পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব নির্ধারণের কাজ চলমান রয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
এদিকে সুরমা নদীর পানি ছাতক পয়েন্টে বিপদ সীমার ২.১৮ মিটার নিচে এবং সুনামগঞ্জ পয়েন্টে ১.২৬ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যা বর্তমানে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক (রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত) সমর কুমার পাল এ তথ্যের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এ জেলার বিভিন্ন হাওরের ধান কাটার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় খোজখবর নিয়ে জেলা প্রসাশনের এই তথ্যচিত্রের কোন মিল পাওয়া যাচ্ছেনা। কৃষকদের ভাষ্যমতে ধানের ময়ালে (এলাকায়) ধান নেই কেবলই হতাশা। সরকার কৃষকদের কথা চিত্মা করে অন্যান্য বছরের ন্যায় এবার ধান কেনা শুরু করলেও কৃষকদের মধ্যে ধান বিক্রির উৎসাহ নেই বললেই চলে। কৃষকরা বলছেন, ধানতাে নেই-ই, আর সরকার যে ধান কিনতে চায়, এ ধরণের শুকনা ভালাে ধান খুব কম কৃষকের কাছে রয়েছে। বেশিরভাগ কৃষকের কাছে যে ধান আছে, এই ধান সরকারি খাদ্য গােদামেতাে নয়-ই, আড়ৎদাররাও নিতে চাচ্ছে না।
সুনামগঞ্জের করচার হাওরপাড়ের লালপুর গ্রামের কৃষক পাভেল মিয়া সোমবার দুপুরে বৃষ্টি ভেজা ধান শুকাচ্ছিলেন। সরকার ১৪৪০ টাকা মণ ধান কিনছে, আপনি ধান দেবেন না, প্রশ্ন করতেই বললেন,‘এবার সরকারি ধান কেনার খবর-ই রাখছি না। অন্যান্য বছর এর চেয়েও ভালাে ধান হয়, তাও সরকারি খাদ্য গাদামে নিয়ে গেলে আদ্রতা নেই ধান কালা বলে ফিরিয়ে দেয়, আর এবারতাে দিতেই পারবাে না। গেল বছর এই সময় পাইকারের কাছে ৩০ মণেরও বশি ধান বিক্রয় করছিলেন। এবার কােন পাইকারও পাচ্ছেন না বলে জানান তিনি।
জেলার সবচেয়ে বড় ধানর আড়ৎ মধ্যনগরের আড়ৎ কল্যাণ সমিতির সভাপতি জহিরুল ইসলাম বললেন, বৈশাখের ১৫২০ তারিখ দিনে অন্তত ২০-২৫ হাজার মণ ধান কেনা হয় মধ্যনগর আড়তপ। সোমবার তারা সকলে মিলে চার-পাঁচশো মণ ধানও কিনতে পারেন নি। এভাবেই যাচ্ছে এখন দিন। মধ্যনগর ধানের ময়ালে (এলাকা) তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, মহেষখলা, কলমাকান্দায় এবার ধান-ই নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। বললেন- আশুগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, চাঁদপুর ও ময়মনসিংহর মিলাররা ভেজা ধানও কিনছে না। ধান বিক্রয়ের জন্য ময়ালের কােন বড় কৃষক যােগাযাগ-ই করছেন না বলে জানালেন এই আড়ৎদার।
সুনামগঞ্জ খাদ্য গােদামে প্রথম দিন ধান দিলন ২ কষক
একদিকে জলাবদ্ধতায় এখনাে হাওরে তলিয়ে আছে ধান, অন্যদিক খারাপ আবহাওয়ায় রােদের অভাবে খলাতে পচন ধরছে ধান। এমন সময় শুরু হয়ছে কষকের কাছ থেকে সরকারি মূল্যে ধান সংগ্রহ। হাওরাঞ্চলের কৃষকদের কথা চিত্মা করে ১২ দিন এগিয়ে ২রা মে রবিবার থেকে ধান সংগ্রহ শুরু করেছে সরকার। বিকাল সাড় ৪টায় সুনামগঞ্জর মল্লিকপুর এলএসডিত (গুদাম) আনুষ্ঠানিক ভাবে ক্রয় শুরু করেন সদর উপজলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা জরিন ও জেলা খাদ্য কর্মকর্তা এবিএম মুশফিকুর রহমান। ক্রয়ের প্রথম দিন ৫ টন ধান বিক্রি করেছেন মাত্র ২জন কষক। তারা বলছেন, হাওর তলিয় যাওয়ায় সর্বােচ ১৪ শতাংশ আদ্রতা, উজ্জ্বল রঙ সহ সরকার নির্ধারিত যে মানদন্ডের ধান কৃষকের পক্ষে দেয়া কঠিন হয়ে যাবে। হাওর তলিয়ে গেলেও সুনামগঞ্জের জন্য বরাদ্দ ২১ হাজার মট্টিক টন ধানের টার্গেট পূরণ হবে বলে জানিয়েছেন খাদ্য কর্মকর্তা। একই সাথে জেলার অন্যান্য উপজেলার এলএসডিতে সরকারি ভাবে ধান ক্রয় কর্মসূচি শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।
ধান বিক্রয়কারী ব্রাহ্মণগাঁওয়ের কৃষক আছদ্দর আলী বলেন, মেঘ বাদলে ধান শুকানাে যাচ্ছে না। আমার আরও ধান ভেজা আছ। বাদলীর আগে যে ধান কটছিলাম সেই ধান এখন বিক্রি করতে পারছি।
গুদামে থাকা অপর কৃষক বলেন, জেলার ৮০ শতাংশ ধান তলিয়ে গেছে জলাবদ্ধতায়। রোদের দেখা মিলছে না। হাজার হাজার কৃষকের করুন অবস্থা। এমন অবস্থায় সরকারি নিয়মের উজ্জ্বল রঙ, ভালা শুকােনাপ (১৪ শতাংশ আদ্রতা) আরও নিয়ম কানুন মেনে এবছর ধান বিক্রি করা কৃষকের পক্ষে সম্ভব হবে না। এবারের ধান বৃষ্টি খেতে খেতে আর তলিয়ে কালা হয়ে গেছে।
জেলা খাদ্য কর্মকর্তা এবিএম মুশফিকুর রহমান বলেন, আমাদের জেলার ধান উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ১৪ লক্ষ মট্টিক টন। আমরা ধান সংগ্রহ করবাে মাত্র ২১ হাজার মেট্টিক টন। জেলার তুলনায় যা কিঞ্চিৎ পরিমান। এই ধান আশা করা যায় পাওয়া যাবে। কৃষকদের নায্য মূল্য নিশ্চিত করে খাদ্য বিভাগ কৃষকের পাশে থাকবে বলে জানান তিনি।
সুনামগঞ্জ সদর উপজলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা জরিন বলেন, এবছর ধান শুকানাে নিয়ে কৃষকরা দুর্ভােগ পােহাচ্ছেন। সে কথা চিত্মা করে প্রত্যেক এলএসডিতে (গুদাম) বলে দেয়া হয়েছে কৃষকের ধান যদি ভেজা থাকে, তাহলে গুদামই শুকিয়ে যেন রাখা হয়। গুদামে শুকানাের পর্যাপ্ত জায়গা রাখা হবে কৃষকের জন্য।