নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি খাতে। বিশেষ করে বিলাসপণ্য হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিগত রিকন্ডিশন গাড়ির আমদানি আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট, ব্যবসায়িক স্থবিরতা এবং ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস-সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গাড়ি আমদানিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে।
বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতি মাসে গড়ে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ ইউনিট রিকন্ডিশন গাড়ি খালাস হতো। তবে ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বাড়তে থাকলে মার্চ ও এপ্রিল মাসে গাড়ি খালাস অর্ধেকে নেমে আসে।
২০২৫ সালের মার্চ-এপ্রিল দুই মাসে যেখানে ২ হাজার ৮১৭টি গাড়ি আমদানি হয়েছিল, সেখানে ২০২৬ সালের একই সময়ে এসেছে মাত্র ১ হাজার ২৪১টি গাড়ি। অর্থাৎ আমদানি কমেছে ৫৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ। চলতি বছরের মার্চে আমদানি হয়েছে মাত্র ৪৯৭ ইউনিট এবং এপ্রিলে এসেছে ৭৪৪ ইউনিট গাড়ি। ক্যালেন্ডার ইয়ার হিসেবেও একই চিত্র দেখা গেছে।
২০২৫ সালের প্রথম চার মাসে ৪ হাজার ৭২৭টি গাড়ি আমদানি হলেও ২০২৬ সালের একই সময়ে এসেছে মাত্র ২ হাজার ৯১২টি, যা ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশ কম।
২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ৩১টি জাহাজে মোট ১৪ হাজার ১৬৪ ইউনিট রিকন্ডিশন গাড়ি আমদানি হয়েছিল। ওই বছরের মার্চ মাসেই একক মাস হিসেবে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯৫৯টি গাড়ি আমদানি হয়, যা ছিল স্মরণকালের রেকর্ড। কিন্তু চলতি বছরের শেষ দুই মাসে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে।
রিকন্ডিশন গাড়ি ব্যবসায়ীরা জানান, সাধারণত মার্চ থেকে মে পর্যন্ত সময়কে গাড়ি ব্যবসার মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। কারণ প্রতি বছরের বাজেটে গাড়ির দাম বাড়ার আশঙ্কায় ক্রেতারা আগেভাগে গাড়ি কিনতে চান। একই সঙ্গে বিক্রেতারাও কম লাভে বেশি গাড়ি বিক্রি করে নতুন চালান আনার চেষ্টা করেন। ফলে এই সময়ে মাসে দেড় হাজারের বেশি গাড়ি আমদানি হয়। কিন্তু এবার ঠিক উল্টো চিত্র-আমদানি ও বিক্রি দুটোই সবচেয়ে কম।
রিকন্ডিশন গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডার সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলেও মূল সমস্যা হলো মানুষের হাতে টাকা না থাকা। ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে, বাজারে গাড়ির চাহিদা কমেছে।
সরকারি প্রকল্পে গাড়ি কেনা প্রায় বন্ধ, কর্পোরেট অফিসগুলোর গাড়ি ঋণ সুবিধাও সীমিত হয়ে গেছে। ফলে গাড়ি এখনো সাধারণ মানুষের কাছে বিলাসপণ্য হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে একটি গাড়ি আমদানিতে ৮০০ থেকে ২ হাজার শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়। পাশাপাশি জাপান থেকে ৫ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ি আমদানির সুযোগ নেই। শুল্ক কমানো এবং গাড়ির বয়সসীমা ৫ বছর থেকে ৭ বা ৮ বছরে উন্নীত করা গেলে বাজারে গাড়ির দাম কমবে এবং বিক্রি বাড়বে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন জানান, রিকন্ডিশন গাড়ি কাস্টমসের রাজস্ব আয়ের অন্যতম বড় খাত। এ খাত থেকে বছরে গড়ে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আসে। তবে আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্বও কমেছে। ২০২৫ সালের প্রথম চার মাসে এ খাত থেকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হলেও চলতি বছর একই সময়ে এসেছে মাত্র ৫৪৫ কোটি টাকা।
গাড়ি ব্যবসার মন্দাভাব সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের কারশেডে। নতুন কারশেডে ৬০০টি গাড়ি রাখার সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে সেখানে রয়েছে মাত্র ২১৮টি গাড়ি। স্বাভাবিক সময়ে সেখানে ৭০০ থেকে ৮০০ গাড়ি পর্যন্ত রাখা হতো।
চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, বন্দরে মোট তিনটি কারশেডে ১ হাজার ২৫০ ইউনিট গাড়ি রাখার সক্ষমতা রয়েছে। বর্তমানে সেখানে মোট ৬১৪টি গাড়ি আছে, যার মধ্যে ৪১৩টি নিলামযোগ্য পুরোনো গাড়ি।
নিয়মিত আমদানি না থাকায় এখন কারশেডগুলো অনেকটাই ফাঁকা পড়ে আছে। তিনি বলেন, আগে ব্যবসায়ীরা পুরোনো চালান ছাড় করেই নতুন চালান আনতেন, এখন সেই গতি একেবারেই নেই।