চব্বিশের গণআন্দোলনের সঙ্গে স্বাধীনতাকে সমান করে ফেললে তা বড় বিপর্যয়ের কারণ হবে বলে মন্তব্য করেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা একবারই এসেছে। এর আগেও আসেনি, এর পরেও আসবে না। এই স্বাধীনতার পর আমাদের যে রাজনৈতিক অর্জনগুলো, সেখানে অনেক অর্জন আমাদের আছে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমাদের বড় একটা অর্জন আমরা স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছিলাম। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছি। আমাদের বড় একটা অর্জন, নিঃসন্দেহে। স্বাধীন দেশে এই রাজনৈতিক অর্জনগুলোকে আমরা শ্রদ্ধা করি, সম্মান করি। তাই বলে এই অর্জনগুলোর সঙ্গে আমরা যদি স্বাধীনতাকে সমানতালে করে ফেলি, সেটা আমাদের জন্য হবে অনেক বড় একটা বিপর্যয়ের কারণ। গতকাল শনিবার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন-ডিএসসিসি আয়োজিত বীর মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব বলেন।

মন্ত্রী বলেন, আমাদের ঠিকানা মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের ঠিকানা ৭১। কাজেই আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছি, এই মহান স্বাধীনতা এনেছি, আপনাদের সঙ্গে একমত হয়ে বলতে চাই, বাংলাদেশের স্বাধীনতা একবারই এসেছে। এর আগেও আসেনি, এর পরেও আসবে না। তাই আমি মনে করি আমাদের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন আমাদের স্বাধীনতা। অনুষ্ঠানে সঠিক মুক্তিযোদ্ধা, একাত্তরের শহীদ ও রাজকারদের তালিকা হালনাগাদ করার কথা বলেন আহমেদ আযম খান।

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার ব্যাপারে মন্ত্রী বলেন, এটা বহুল আলোচিত একটি বিষয় যে, স্বাধীনতার মাত্র ২৩ দিন পর হঠাৎ করেই কোনো রকমের জরিপ ছাড়া, তথ্য-উপাত্ত ছাড়া নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের তালিকা কী করে এলো, হুট করে একটি তালিকা ৩০ লক্ষ বলে দিলেন। তাই আমি মনে করি যে, এই শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন, মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন এবং ওই মুহূর্তে যারা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ছিল, রাাজাকার, আলবদর, আলশামস-তাদেরও সঠিক তালিকা প্রণয়ন আমার মন্ত্রণালয়ের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

মন্ত্রী বলেন, এই চ্যালেঞ্জকে যদি আমি এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকি, তাহলে আমি এই চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে সংসদের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য তৈরি করে এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করে সঠিক তালিকা জাতির সামনে প্রকাশ করব ইনশাআল্লাহ, আপনাদের কাছে কথা দিচ্ছি। মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসন, ভাতা, বিনা খরচায় সুচিকিৎসা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে বলেও জানান তিনি।

অনুষ্ঠানের সভাপতি ও ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আবদুস সালাম বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দেওয়া না হলে দেশ কখনো এগিয়ে যেতে পারে না। মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো দল নেই, তাঁরা এদেশের। তিনি আরও বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা দেশের মালিকানার একমাত্র দাবিদার হওয়া সত্বেও তারা দেশে সবসময় জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তিনি আরও ঘোষণা দেন, ভবিষ্যতে আমি মেয়র নির্বাচিত হলে ঢাকা মহানগরীর অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের স্বচ্ছল করার পূর্ণ দায়িত্ব ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নিবে। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা, আবাসন ও উন্নত পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ঢাক মহানগরীর প্রায় দেড় হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধা অংশগ্রহণ করেন।

জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সঙ্গীতের সাথে শুরু হওয়া এ অনুষ্ঠানে বীর শহিদগণের স্মরণে ১ (এক) মিনিট নিরবতা পালন ও মুক্তিযুদ্ধের উপর বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। পরবর্তীতে, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানার্থে সম্মাননা স্মারক, ফুলেল শুভেচছা ও উত্তরীয় প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে একাত্তরের রণাঙ্গনের স্মৃতিচারণ করেন ক্যাপ্টেন নুরুল হুদা, সিটুসি, ৯নং সেক্টর; বীর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক নঈম জাহাঙ্গীর ও সদস্য-সচিব সাদেক আহমেদ খান; জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের আহ্বায়ক ইশতিয়াক আজীজ উলফাত এবং বিএনপির মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক লেঃ কঃ (অবঃ) জয়নাল আবেদীনসহ প্রমুখ।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত স্কুলের শিক্ষার্থীরা দেশাত্মবোধক গান ও নৃত্য পরিবেশন করেন। এছাড়া, বেবি নাজনীন, ইথুন বাবু, রিজিয়া পারভীন, মৌসুমি চৌধুরী ও শিবা শানুর মতো প্রথিতযশা শিল্পীরা পরিবেশনায় অংশগ্রহণ করেন। নগর ভবন প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এ সংবর্ধনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সকাল ১০টায় শুরু হয়ে সন্ধ্যা ৭টায় শেষ হয়।