খুলনায় যেন থামছেই না রক্তপাত। মহানগরী থেকে শুরু করে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গত এক মাসে একের পর এক গুলিবর্ষণ, কুপিয়ে হত্যা, সশস্ত্র হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, জমিজমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব ও পূর্ব শত্রুতাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন কয়েকজন, আহত হয়েছেন আরও অনেকে। বিশেষ করে মে মাসজুড়ে খুলনা মহানগরী, দৌলতপুর, লবণচরা, সোনাডাঙ্গা, বটিয়াঘাটা ও কয়রায় ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক সহিংসতায় উদ্বেগ বাড়ছে সর্বস্তরে। নগরবাসীর প্রশ্ন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে কি না। যদিও পুলিশ বলছে, প্রতিটি ঘটনায় তদন্ত চলছে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সর্বশেষ গতকাল রোববার ভোর সাড়ে ৫ টার দিকে খুলনার হরিণটানা থানাধীন কৈয়া বাজার জয়খালী ব্রিজ সংলগ্ন বাইতুল মা’মুর জামে মসজিদের বারান্দায় ডালিম গাজী (৪১) নামের একজন দিনমজুরের লাশ পাওয়া গেছে। নিহত ডালিম গাজী খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর এলাকার আবুল হোসেন গাজী ও ভানু বিবির সন্তান। পেশায় তিনি একজন দিনমজুর। নিহতের মাথায় ইটের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। পাশে রক্তাক্ত ইট পাওয়া গেছে। কে বা কারা মেরেছে এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। ঘটনাস্থলে সিআইডি টিম আলামত সংগ্রহের কাজ শেষ করে লাশ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ এর প্রক্রিয়া চলছে। এ হত্যাকা-ের পর পরই স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

গত শনিবার মহানগরীর দৌলতপুর থানার পশ্চিমপাড়া খুঁটির ঘাট এলাকার একটি মাছের ঘের থেকে ওমর ফারুক (৩২) নামে এক যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। দুপুরে স্থানীয়রা ওমর ফারুক নামে এক ব্যক্তির মাছের ঘেরে লাশটি পড়ে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দেয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশ উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পুলিশ জানায়, নিহত ওমর ফারুক খানজাহান আলী থানার জাব্দিপুর এলাকার ইব্রাহিম শেখের ছেলে। তার শরীরে দুটি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, শুক্রবার রাত ৯টার দিকে এলাকায় গুলির শব্দ শোনা গিয়েছিল। তবে তখন কেউ ঘটনার প্রকৃত কারণ বুঝতে পারেননি। দৌলতপুর থানার ওসি মু: মোরাদুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনার রহস্য উদঘাটন ও জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।’

শুক্রবার (২২ মে) সকালে নিজ বাড়িতে দুই ভাইয়ের মধ্যে তর্ক-বিতর্কের একপর্যায়ে নগরীর নবপল্লী এলাকায় জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধে ছোট ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন বড় ভাই আবুল কালাম আজাদ (৪৫)। আহত আবুল কালাম আজাদ বর্তমানে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

বৃহস্পতিবার (২১ মে) দুপুরে খুলনা মহানগরীর লবণচরা থানাধীন পুটিমারী বাজার এলাকায় বিএনপি অফিসে ঢুকে যুবদল সদস্যসহ দুইজনকে গুলি করে আহত করার ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আহতরা হলেন পুটিমারী বাজার কমিটির সভাপতি ও যুবদল সদস্য মাসুম বিল্লাহ (৩৫) এবং জাহিদ (৩৫)। বর্তমানে তারা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে চিকিৎসাধীন। স্থানীয় সূত্র জানায়, ঘটনার সময় তারা বিএনপি অফিসে বসে ছিলেন। এ সময় পারভেজ (৩৪) নামে এক ব্যক্তি সেখানে প্রবেশ করে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে গুলি চালায়। এতে মাসুম বিল্লাহর পায়ে এবং জাহিদের হাতে গুলি লাগে। ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অভিযুক্তকে গ্রেফতারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। লবণচরা থানার ওসি সৈয়দ মোশারেফ হোসেন জানান, পূর্ব শত্রুতার জেরেই হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

মঙ্গলবার (১৯ মে) নগরীর জাতিসংঘ পার্ক সংলগ্ন খাদ্য পরিবহন সংরক্ষণ ঠিকাদার সমিতির অফিসে গুলিবর্ষণের ঘটনায় সমিতির সহ-সভাপতি শেখ হারুনুর রশিদ (৬২) গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশ জানায়, দুই পক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে সংঘর্ষ বাধলে গুলির ঘটনা ঘটে।

সোমবার (১৮ মে) খুলনা জেলার কয়রা উপজেলায় ভবতোষ মৃধা (৪০) নামে এক ওষুধ ব্যবসায়ীকে নিজ ঘরে ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পুলিশ জানায়, গভীর রাতে একদল হামলাকারী সিঁধ কেটে ঘরে প্রবেশ করে। বাধা দিতে গেলে ভবতোষ মৃধাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ সময় তার স্ত্রীও আহত হন। স্থানীয়রা গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

রোববার (১৭ মে) খুলনা মহানগরীর পশ্চিম বানিয়াখামার এলাকায় ব্যবসায়ী আলী নূর ডাবলুকে (৫০) লক্ষ্য করে গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, তিনটি মোটরসাইকেলে করে আসা ৬ থেকে ৮ জন দুর্বৃত্ত তাকে লক্ষ্য করে চার রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এতে তার বাম হাতে গুলি লাগে। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।

শুক্রবার ৮ মে খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলায় আজিজুল ইসলাম (৩৮) নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। রাঙ্গেমারী এলাকার একটি প্লটে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ফেলে রেখে যায় হামলাকারীরা। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। নিহত আজিজুল ইসলাম বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা। হত্যার কারণ উদঘাটনে তদন্ত করছে পুলিশ।

সোমবার (৪ মে) খুলনা মহানগরীর কোবা মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় রাজু হাওলাদার (৩৮) নামে এক যুবককে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। গুলিতে গুরুতর আহত রাজুকে প্রথমে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে রূপসার কুদির বটতলা এলাকায় পৌঁছালে এম্বুলেন্স লক্ষ্য করে আবারও গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। আতঙ্কিত চালক দ্রুত গাড়িটি কাটাখালী হাইওয়ে থানায় নিয়ে আশ্রয় নেন। পরে পুলিশের সহযোগিতায় পুনরায় ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয় এম্বুলেন্সটি।

ধারাবাহিক এসব গুলিবর্ষণ, কুপিয়ে হত্যা ও সশস্ত্র হামলার ঘটনায় খুলনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিকরা। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, প্রতিটি ঘটনায় তদন্ত চলছে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে কেএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ বিভাগ) মো. রেজাউর রহমান বলেন, কোন ধরনের ঘটনার পর অভিযুক্তদের গ্রেফতারের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যরা অভিযান পরিচালনা করে তাদেরকে গ্রেফতার করছেন। এছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপুর্ণ সড়কে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশী চালানো হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দার সংস্থার টিম মাঠে রয়েছে।