মো. আক্তারুজ্জামান, মনিরামপুর (যশোর) : আসন্ন বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন মনিরামপুর পৌরবাসী। সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের বাইলেন অধিকাংশ সড়ক হাঁটুপানিতে তলিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নতুন নয়; বরং বছর ঘুরে তা আরও ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। প্রায় ৫০ হাজারে অধিক মানুষের বসবাস এই পৌর এলাকায়, পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকা, সড়ক দখল করে স্থাপনা নির্মাণ এবং নির্মাণ অনুমোদনে অনিয়ম সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ নগর সংকট তৈরি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পৌরসভার প্রকৌশল শাখায় নকশা অনুমোদন এখন যেন এক প্রকার ‘বাণিজ্যে’ পরিণত হয়েছে। সহকারী কর্মকর্তা এস এম তপু’র বিরুদ্ধে উঠেছে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ। নাগরিকদের দাবি, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তিনি দেনদরবারের মাধ্যমে টাকা নিয়ে নকশা অনুমোদন দেন, আবার অনেক ক্ষেত্রে টাকা নেওয়ার পরও দীর্ঘদিন নকশা বুঝিয়ে দেন না।

বিজয়রামপুর গ্রামের ইউসুপ আলী জানান, প্রায় পাঁচ মাস আগে ১৫ হাজার টাকায় নকশা তৈরির জন্য রাজি করানো হলেও এখনো তিনি চূড়ান্ত নকশা পাননি। ফলে তার বাড়ি নির্মাণ কাজ আটকে আছে। একই ধরনের অভিযোগ জয়নগরসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের কাছ থেকেও পাওয়া গেছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, টাকা দিয়ে পৌরসভায় নকশা ‘দেখিয়ে’ নিজেদের মতো করে বাইরের প্রকৌশলী দিয়ে নকশা বানিয়ে নির্মাণ কাজ শুরু করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত কর্মকর্তা এস এম তপু সময়ক্ষেপণের কথা স্বীকার করে বলেন, “নকশা অনুমোদনে সময় লাগে, কারণ মিটিংয়ের মাধ্যমে অনুমোদন নিতে হয়।” তবে নির্ধারিত ফি বা সময়সীমা সম্পর্কে স্পষ্ট জবাব এড়িয়ে যান তিনি।

এদিকে, নকশা ও অনুমোদনে এমন দায়সারা মনোভাবের সরাসরি প্রভাব পড়ছে পুরো পৌর অবকাঠামোয়। শহরের অধিকাংশ সড়কের গা ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ফলে ড্রেন ও ফুটপাতের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও সড়কের প্রস্থ এতটাই কম যে একটি ভ্যান চলাচল করাও কঠিন; সেখানে ফায়ার সার্ভিস বা অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ করা কার্যত অসম্ভব। জরুরি পরিস্থিতিতে এটি বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি করছে।

ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল দশা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অধিকাংশ এলাকায় কার্যকর ড্রেন নেই, আর যেগুলো আছে সেগুলোও অপর্যাপ্ত ও অপরিচ্ছন্ন। ময়লা-আবর্জনায় ভরে গিয়ে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে থাকে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে থেকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। গত বর্ষায় এমন ভোগান্তিতে পড়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে পৌরবাসীকে—এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

প্রথম শ্রেণীর পৌরসভায় বাড়ি ও স্থাপনা নির্মাণে কিছু বাধ্যতামূলক নীতিমালা মানা জরুরি। এর মধ্যে রয়েছেÑ সড়ক থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে ভবন নির্মাণ (সেটব্যাক), ড্রেন ও ফুটপাতের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা সংরক্ষণ, প্লটের একটি অংশ খোলা রাখা যাতে পানি শোষণ সম্ভব হয়, জলাবদ্ধ জমিতে নির্মাণের আগে পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করা এবং জরুরি যান চলাচলের জন্য অন্তত ৪.৫ মিটার সড়ক প্রস্থ বজায় রাখা। কিন্তু মনিরামপুর পৌরসভায় এসব নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগ নেই বলেই অভিযোগ স্থানীয়দের।

পৌরবাসী হাফিজুর রহমান বাবু বলেন, “টাকার বিনিময়ে অনুমোদন দিয়ে যাকে যেমন খুশি নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এটা পুরোপুরি পৌর কর্তৃপক্ষের গাফিলতি।” একইভাবে স্থানীয় শিক্ষক আবদুল মজিদ বলেন, “অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ও ময়লা ব্যবস্থাপনার কারণে বর্ষায় শহর কার্যত অচল হয়ে পড়ে।” হাকোবা, মনিরামপুর সদর, মহোনপুর ও বিজয়রামপুর এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে অসংখ্য ভবন সড়কের একদম গা ঘেঁষে নির্মিত হয়েছে এবং ভেতরের বাই-সড়কগুলো এতটাই সরু যে জরুরি সেবার যানবাহন প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। সব মিলিয়ে, মনিরামপুর পৌরসভা এখন অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্রশাসনিক গাফিলতি এবং অনিয়মের এক জটিল ফাঁদে আটকে পড়েছে। বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে এই সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে নাগরিক দুর্ভোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করবে—এমনটাই মনে করছেন সচেতন মহল।