সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে আবারও বাড়তে শুরু করেছে বনদস্যুদের তৎপরতা। দস্যুবাহিনীর নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার খবরে উপকূলীয় অঞ্চলের বনজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের মাঝে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মধুর মওসুম শুরু হলেও দস্যু আতঙ্কে বনের ভেতরে প্রবেশ করতে সাহস পাচ্ছেন না মৌয়ালরা। শুধু মৌয়াল নয়, সুন্দরবনের নদ-নদীতে মাছ ও কাঁকড়া আহরণকারী জেলে এবং বাওয়ালীরা চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন।
জেলে বাওয়ালীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও দস্যু দমনে সাফল্যের ফলে সুন্দরবনে শান্তি ফিরে আসে জেলেদের মাঝে। তবে বিগত ১ বছরে আবারও বনদস্যু বাহিনী বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা জেলেদেরকে জিম্মি করে অর্থ আদায়ের পাশাপাশি নানা নির্যাতন শুরু করেছে। সম্প্রতি মধু আহরন মওসুম শুরু হলে সব বাহিনী সক্রিয় হয়ে উঠে। তারা মৌয়ালদের নিকট অতিরিক্ত অর্থ আদায় করার জন্য নানা হুমকি ধামকি অব্যাহত রেখেছে।
দস্যু চক্রের নতুন করে সংগঠিত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় মৌয়াল ও জেলেদের ট্রলারে হামলা এবং অপহরণের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আবার দুই এক বাহিনী বেপরোয়া অত্যাচার করলেও নাম বদলে নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করছে।
একটি সুত্রে জানা গেছে, গত ৭ এপ্রিল সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় আতিয়ার রহমান নামের এক কাঁকড়া জেলে কলাগাছিয়া এলাকায় গুলীবিদ্ধ হন। মজনু আলিফ বাহিনী এই তান্ডব লিলা চালায়। তবে বিভিন্নভাবে প্রচারণা চালানো হয়েছে ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী তার উপর গুলী চালায়। আলিফ বাহিনীর এই ঘটনাটি ভিন্নখাতে নেওয়ার জন্য ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর উপর দায় চাপানো হচ্ছে। এর রহস্য জানতে পারছে না ভুক্তভোগীরা। মজনু বাহিনী ঐ এলাকায় নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। গত বছরের তুলনায় এ বছর অনেক কম মৌয়াল মধু আহরন করতে গেছে সুন্দরবনে। তবে বনদস্যুদের সাথে অর্থের বিনিময়ে সমঝোতা করতে পারলে অনেকেই গহীন বনে যাবে মধু আহরন করতে।
মৌয়ালরা জানান, মধু সংগ্রহের জন্য এই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা বনের ভেতরে যেতে পারছেন না। অন্যদিকে, জেলেরা বলছেন, দস্যুদের চাঁদা না দিলে বনের খালে মাছ ধরা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঝিদেরও পোহাতে হচ্ছে একই দুর্ভোগ।
অনেক মৌয়াল বলেন, প্রতি নৌকায় ১ থেকে দেড় লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে। যা কোন মৌয়ালের পক্ষে সম্ভব নয়। এ বিষয়ে বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা সজাগ রয়েছে। দস্যু দমনে বন রক্ষীদের পাশাপাশি কোস্ট গার্ড ও নৌ-পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। বনজীবীদের আশ্বস্ত করে প্রশাসন বলছে, বনের ভেতর জানমালের নিরাপত্তা দিতে সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে সাধারণ বনজীবীদের দাবি টহল কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি গহীন বনে দস্যুদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হোক। অন্যথায় বনের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার পরিবার অনাহারে দিন কাটাবে। এতে করে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাবে।
এদিকে সুন্দরবনের গহীনে অভিযান চালিয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় তিনটি দেশীয় বন্দুক ও চার রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করেছে বনবিভাগ। তবে এসময় কোনো দুষ্কৃতিকারীকে আটক করতে পারেনি তারা। গত শুক্রবার সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের কোবাদক স্টেশনের আওতাধীন কঞ্চির খালের বাইনতলা থেকে এসব অস্ত্র ও গুলী উদ্ধার করা হয়।
বনবিভাগ জানায়, টহলরত বনকর্মীরা সন্দেহজনক গতিবিধি লক্ষ্য করে বনদস্যুদের ধাওয়া করে। এ সময় দুষ্কৃতিকারীরা বনের গভীরে পালিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থলে ব্যাপক তল্লাশি চালিয়ে তিনটি দেশীয় বন্দুক ও চারটি বন্দুকের কার্তুজ উদ্ধার করা হয়।
বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, সুন্দরবনে অপরাধ দমনে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি। বনজ সম্পদ ও বন্যপ্রাণি রক্ষায় নিয়মিত অভিযান আরো জোরদার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত অস্ত্র পুলিশের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।