মুঃ শফিকুল ইসলাম, গোমস্তাপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ): একসময় ‘গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু’ -এই কথাটি ছিল বাস্তবতার প্রতিফলন। কৃষকের ঘরে ধান মানেই ছিল বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। আর সেই ধান বছরের পর বছর ভালো রাখার জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় ছিল মাটির কুঠি। এঁটেল মাটির স্তরে স্তরে গড়ে ওঠা এই কুঠি তৈরিতে যেমন শ্রম ছিল, তেমনি ছিল দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ছাপ। কয়েকদিন ধরে ধাপে ধাপে তৈরি হতো এর কাঠামো, যা একদিকে টেকসই, অন্যদিকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক।
কুঠির নির্মাণশৈলীতে ছিল গ্রামীণ বুদ্ধিমত্তার অনন্য প্রকাশ। মেঝে থেকে কিছুটা উঁচুতে বসানো হতো যাতে আর্দ্রতা না লাগে। নিচে থাকত একটি ছোট মুখ, যা কাপড়ের কুণ্ডলী দিয়ে বন্ধ রাখা হতো। প্রয়োজনমতো সেই মুখ খুলে ধান বের করা যেত। কোনো আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই কতটা বিজ্ঞানসম্মত ও কার্যকর ছিল এই পদ্ধতি—তা আজও বিস্ময় জাগায়।
ধান কাটার মৌসুম এলেই গ্রামে নেমে আসত উৎসবের আমেজ। খড়ের পালার পাশে বাঁধা থাকত গরু, উঠোনজুড়ে চলত ধান মাড়াই আর শুকানোর কাজ। সেই ধান যত্ন করে তুলে রাখা হতো কুঠিতে যেন পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত। কুঠি তখন শুধু একটি পাত্র নয়, ছিল কৃষকের স্বপ্ন আর পরিশ্রমের ভাণ্ডার।
কিন্তু আজকের বাস্তবতা ভিন্ন। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে গেছে সংরক্ষণ পদ্ধতি। প্লাস্টিকের ড্রাম, টিনের পাত্র, বেত বা বাঁশের তৈরি ডুলি এসবই এখন কুঠির জায়গা দখল করে নিয়েছে। সহজ ব্যবহার, কম সময় ও কম শ্রমের কারণে এগুলো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু এর আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে একটি পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থা।
প্রশ্ন হলো আমরা কি উন্নয়নের নামে আমাদের শিকড় ভুলে যাচ্ছি? কুঠি ছিল সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপকরণে তৈরি, যা খাদ্য সংরক্ষণে নিরাপদ এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়। আজ যখন বিশ্ব পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের কথা বলছে, তখন আমরা নিজেরাই আমাদের ঐতিহ্যকে বিস্মৃতির অতলে ঠেলে দিচ্ছি।
এখনো কিছু গ্রামে ছোট আকারের কুঠির দেখা মেলে। হয়তো তা আগের মতো বিশাল নয়, কিন্তু তবুও এটি ঐতিহ্যের শেষ চিহ্ন হয়ে টিকে আছে। যারা এখনো এই কুঠি ব্যবহার করছেন বা সংরক্ষণ করছেন, তারা আসলে একটি ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখছেন যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অমূল্য শিক্ষা হতে পারে।
এই ঐতিহ্য রক্ষায় এখনই উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। স্থানীয় প্রশাসন, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও গবেষকদের এগিয়ে আসতে হবে। গ্রামীণ জাদুঘর, পাঠ্যপুস্তক বা গণমাধ্যমে কুঠির ইতিহাস ও ব্যবহার তুলে ধরা যেতে পারে। প্রয়োজনে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে সমন্বয় করে কুঠির নতুন সংস্করণ তৈরি করাও সম্ভব।
কারণ, একদিন হয়তো আমাদের সন্তানেরা জিজ্ঞেস করবে “কুঠি কী?” তখন যদি আমাদের কাছে শুধু গল্প থাকে, কোনো বাস্তব নিদর্শন না থাকে তাহলে সেটি হবে আমাদের সাংস্কৃতিক ব্যর্থতা। কুঠি হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি পাত্রের বিলুপ্তি নয়; এটি আমাদের কৃষিভিত্তিক ঐতিহ্য, আমাদের ইতিহাস, আমাদের আত্মপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের হারিয়ে যাওয়া। এখনই সময় এই নীরব বিলুপ্তির বিরুদ্ধে সচেতন হওয়ার। না হলে খুব শিগগিরই ‘কুঠি’ শব্দটিই হয়তো অভিধানের একটি মৃত শব্দ হয়ে যাবে।