বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী

অভিজাত বস্ত্র বলে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী ‘রাজশাহী সিল্ক’ নানামুখি সংকটের মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে না পেরে এর পিছনের কারিগররা পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। দিনে দিনে কমছে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতের সংখ্যাও। ফলে সংকুচিতন হচ্ছে এর পরিধি।

চলতি শতাব্দীর শুরুতেও যেখানে রেশম কারখানার শব্দে সরগরম থাকতো রাজশাহীর বিসিক শিল্প এলাকা- সেখানে এখন ব্যস্ততা নেই। হাতেগোনা কয়েকটি কারখানা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। যদিও এর বিপরীতে দেশে রাজশাহী সিল্কের চাহিদা বেড়েছে। তবে চাহিদা অনুযায়ী কাপড় সরবরাহ না করার পেছনের প্রধান কারণ সুতার সংকট। আর এই সংকটে রাজশাহীর ৭৬টি রেশম কারখানার মধ্যে বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ৮-১০টি। যেগুলো টিকে আছে সেগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। নাম ‘রাজশাহী সিল্ক’ হলেও এই সিল্ক কাপড়ের অধিকাংশ এখন বোনা হয় বিদেশী সুতায়। মূলত চীন থেকে আমদানি করা সুতায় বানানো হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী সিল্কের কাপড়।

রেশম শিল্পের অতীত

রাজশাহীতে রেশম শিল্পের অতীত ইতিহাসে দেখা যায়, অষ্টাদশ এবং উনবিংশ শতাব্দীতে বোয়ালিয়া শহর ও সন্নিহিত এলাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ছোট ছোট দেশীয় কোম্পানি গঠন এবং কুঠি ও আড়ৎ স্থাপন করে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে রেশম সুতা ও রেশমজাত পণ্যের ব্যবসা পরিচালনা করতেন। ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে এই তিনটি কোম্পানির রাজশাহীতে মোট ১৪টি কারখানায় উৎপাদিত রেশমী সুতার পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪৫২ পাউন্ড। বেঙ্গল সিল্ক কোম্পানির বোয়ালিয়ার বড়কুঠিসহ ছিল ১০টি বাণিজ্যিক কুঠি। আর মেসার্স লুই পেইন এন্ড কোম্পানির ছিল ৩টি বাণিজ্যিক কুঠি। এগুলো হলো কাজলা, খোজাপুর ও সাহেবগঞ্জে। পরবর্তী সময়ে খোজাপুর ও সাহেবগঞ্জ পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। মেসার্স এন্ডারসন কোম্পানির একমাত্র কুঠিটি শিরইলে অবস্থিত।

ইউরোপীয় ব্যবসায়ীগণ বাংলার বিভিন্ন এলাকায় উৎপন্ন বিশেষ করে তৎকালীন রাজশাহীর অসংখ্য স্থানে প্রস্তুতকৃত রেশমী সুতা ও বস্ত্রাদি সংগ্রহ করে ইউরোপসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করতেন। এদের মাধ্যমে এই পণ্যের নামকরণ হয়েছিল ‘বেঙ্গল সিল্ক’। পরবর্তীকালে ‘রাজশাহী সিল্ক’ এবং ‘মুর্শিদাবাদ সিল্ক’ নামে বিশেষভাবে পরিচিতি লাভ করে। উল্লেখ্য, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে বিশাল রাজশাহী অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ রেশম শিল্প। এর পাশাপাশি মালদহ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রহনপুর) এবং মুর্শিদাবাদ জেলার ভৈরব তীরবর্তী এলাকায় উৎপাদিত রেশম পণ্যগুলোও ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী সিল্ক হিসেবেই বিদেশের বাজারে পরিচিতি পায়, কারণ এই এলাকাগুলো ছিল রাজশাহী জেলার অন্তর্ভুক্ত।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান

ঐতিহ্যবাহী রেশম শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। তুঁত চাষি, রেশম পোকা পালনকারী, সুতা প্রস্তুতকারী, তাঁত-শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থেকে জীবিকা নির্বাহ করেন। বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের জন্য রেশম শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করেছে, যা নারীর আর্থিক ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি রাজশাহী রেশম বোর্ডেও নিয়মিত চাষ হচ্ছে রেশমের কাঁচামাল। এছাড়াও নগরীর বিসিক শিল্প নগরীতে গড়ে উঠেছে সিল্ক বস্ত্রের বিপণন কেন্দ্র। রাজশাহীর একজন কারখানা মালিক মো. লিয়াকত আলী বলেন, “রাজশাহী বিসিকের ৭৬টি বেসরকারি রেশম কারখানার মধ্যে বেশিরভাগই রেশম সুতার অভাবে বন্ধ রয়েছে। সরকার যদি বেসরকারি খাতকে রেশম সুতা উৎপাদনের অনুমতি দেয় এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে, তাহলে বাংলাদেশ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বাইরের দেশে রপ্তানিও করতে পারে।”

রেশম বস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত লোকেরা জানান, রাজশাহীর রেশম শুধু দেশের বাজারেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিম-লেও একটি পরিচিত নাম। এখানকার উৎপাদিত সুতা ও কাপড়ের মান উন্নত হওয়ায় বিদেশে এর চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে শাড়ি, পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস, স্কার্ফসহ বিভিন্ন পোশাকে রাজশাহীর রেশমের ব্যবহার দিন দিন বেড়েছে। সিল্কের পোশাক বিক্রি দিন দিন বাড়ছে। পাশাপাশি পূর্বের তুলনায় সিল্কের পোশাকের চাহিদা ও জনপ্রিয়তা বেড়েছে। এখানকার সিল্কের পোশাকের চাহিদা সারাদেশেই রয়েছে। এখানে মাঝে মাঝে অনেক বিদেশি ক্রেতারাও আসেন এবং পণ্য পছন্দ করেন। তবে বিক্রি জমজমাট হয় ঈদের সময়। তখন অনেক চাহিদা থাকে।

সংকটে রেশম শিল্প

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নানা সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে রাজশাহীর রেশম শিল্প। কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তার ঘাটতি এবং বাজারজাতকরণে দুর্বলতার কারণে অনেক উদ্যোক্তা টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন। এছাড়া কম দামে বিদেশি সিনথেটিক কাপড় বাজার দখল করায় দেশীয় রেশম শিল্প চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। এর সবচেয়ে পুরনো রোগ হলো বিদেশি সুতা আমদানির উপর ক্রমান্বয়ে নির্ভর হয়ে পড়া। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, তারা তাদের উৎপাদন ঠিক রাখতে সুতা বাইরের দেশ থেকে আমদানি করছেন। দেশীয় রেশমের স্বল্পতা এবং মূল্য বেশি হওয়ায় তারা বাইরের সুতার দিকে ঝুঁকছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিসিক শিল্প নগরীর একটি বিপণী বিতানের স্বত্বাধিকারী বলেন, “বিসিক-এ যতগুলো সিল্কের কাপড়ের দোকান রয়েছে তার বেশির ভাগ দোকানের পণ্য বাইরের সুতা দিয়ে তৈরি। দেশীয় সুতার দাম বেশি হওয়ায় সবাই এখন বাইরের দেশ থেকে সুতা আমদানি করছে। কিন্ত, দেশীয় সুতার মতো মোলায়েম হয় না বিদেশি সুতা। দেশীয় এই রেশম শিল্প টিকিয়ে রাখতে এখন তুঁত চাষ এবং পোঁকা প্রস্তুতের জন্য সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।” এই বিষয়টি নিয়ে বহু আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু এর সমাধানে আগ্রহ দেখা যায় না। মাঠ পর্যায়ের পলু পালন ও সুতা উৎপাদনে জড়িতদের সহায়তার জন্য রেশম বোর্ড কিছু কাঁচামাল সরবরাহ করে থাকে। তবে সেগুলো বাজারের চাহিদা পূরণের জন্য খুবই সামান্য।

সরকারি উদ্যোগ ও সম্ভাবনা

সম্প্রতি রেশম শিল্পের উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগ গ্রহণের কথা জানা গেছে। বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শীর্ষ ব্যক্তিরা রেশম শিল্পের বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং একে আরো উন্নত করার রূপরেখা তৈরি করতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। ‘রাজশাহী সিল্ক শুধু রাজশাহীর নয়, এটি সারা বাংলাদেশের সম্পদ’- রেশম শিল্পের উন্নয়নে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শণ করতে গিয়ে এমন ধারণার কথা তারা জানান দিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত সরকারি সহায়তা, সহজ ঋণ সুবিধা, আধুনিক প্রশিক্ষণ ও রপ্তানি প্রণোদনা বাড়ানো গেলে রাজশাহীর রেশম শিল্প আবারো তার পূর্বের গৌরব ফিরে পেতে পারে। একই সঙ্গে ব্র্যান্ডিং ও ডিজাইন উন্নয়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করা সম্ভব। সিল্কের ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং নিয়ে কাজ করতে হবে। রেশম চাষিদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং যোগ্য লোকদের নিয়োগ দিতে হবে। পাশাপাশি সরকারি মনিটরিং বাড়াতে হবে। যাতে করে সরকারি প্রকল্পের কাজগুলো যথাযথভাবে করা হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন রাজশাহীর সিল্কের উন্নয়নের জন্য।