স্টাফ রিপোর্টার
রোজার শেষদিকে এসে ঢাকায় জমে উঠেছে ঈদ বাজার; বিপণিবিতান আর ফুটপাতে বেড়েছে পাঞ্জাবি বিকিকিনি। তবে অন্যবারের তুলনায় বিক্রি কম বলে ভাষ্য বেশিরভাগ বিক্রেতার। নকশা ও মানভেদে বড়োদের পাঞ্জাবি মিলছে ৫০০ থেকে ৭৫০০ টাকার মধ্যে, আর ছোটদের পাঞ্জাবি মিলছে ৩০০ থেকে ৪ হাজার টাকার ভেতরে। গতকাল বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন বিপণিবিতান, শপিং কমপ্লেক্সসহ ফুটপাতে ঘুরে এ চিত্র মিলেছে।
বেইলি রোডে পাঞ্জাবি বিক্রয়কেন্দ্রে ঘুরছিলেন স্নাতক পড়ুয়া সূচনা হোসেন, সঙ্গে ষাটোর্ধ্ব বাবা আবুল হোসেন। একটি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, অনেক কষ্ট করে বাবাকে নিয়ে এসছি, পাঞ্জাবি কিনব; উনি মার্কেটে আসতেই চান না। শো-রুমগুলো ঘুরে দেখছি, এরপর সিদ্ধান্ত নেব কোনটা কিনব। বাবাতো যা দেখেন, সেটাই বলেন, পছন্দ হয়েছে। আসলে উনি তাড়াতাড়ি মুক্তি চাচ্ছেন। তাই আগে আমি ঘুরে দেখব, তারপর নেব। বাবা, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আবুল হোসেন বলছিলেন, আমার বেশি চকরা-বকরা পছন্দই না, সাদাই ভালো লাগে। কিন্তু ও (মেয়ে) প্রায় সবই দেখছে। সারাদিন রোজা রেখে ঘুরতে ভালো লাগে না, মেয়ের আবদারেই আসা; ফিরে তারাবিও পড়তে হবে। কিন্তু সে মনে হয় সহজে ছাড়বে না।
বেইলি রোডে তৈরি পোশাক ব্র্যান্ড ইয়োলোর বিক্রয়কেন্দ্রে বেশ ভিড় চোখে পড়ল। সেখানে বন্ধুদের সঙ্গে এসেছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাফসান সাদিক। তিনি বলেন, কিছুক্ষণ আগেই এসছি। ঘুরে দেখছি, পছন্দ হলে নিয়ে নেব। কালো পাঞ্জাবি নেওয়ার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু গরমের কারণে একটু দুশ্চিন্তা হচ্ছে। দেখা যাক, কোনটা নিই।
ইয়োলোর বিক্রয়কর্মীরা জানালেন, তাদের কাছে সর্বোচ্চ সাড়ে সাত হাজার টাকা দরের পাঞ্জাবি রয়েছে। কাবলি মিলছে সাড়ে চার হাজার থেকে সাড়ে ছয় হাজার টাকার ভেতর। রোজার শেষ দিকে এসে বিক্রি বেড়েছে জানিয়ে তারা বলছিলেন, পাঞ্জাবি ও কাবলি- দুটোতেই গ্রাহকরা ভালো আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
বিক্রি কম : বেইলি রোডে আরেক ব্র্যান্ড আর্টিসানর ব্যবস্থাপক আব্দুস সালাম বলছিলেন, এবার পাঞ্জাবি কেনাবেচা অন্য বারের তুলনায় কম; বিক্রিও শুরু হয়েছে কিছুটা দেরিতে। অন্যান্যবার এই সময় শোরুমে ভিড় থাকে, কিন্তু এবার তেমন নেই। রোজার অর্ধেক শেষ হওয়ার পর গত শুক্র-শনিবার কিছু কাস্টমার ছিল। গতকাল-আজ কম। অফিসের কারণে কেনাবেচা হচ্ছে না। আর মানুষের হাতেও লিকুইড ক্যাশটা কম। আবার বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণেও মানুষ খরচ কম করছে। আর্টিসানে ছোট ও বড়দের পাঞ্জাবি মিলছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকার ভেতর। এবারের ঈদে ফ্যাশন ব্র্যান্ডটি কোনো কাবলি সেট বাজারে আনেনি। এর কারণ ব্যাখ্যা করে আব্দুস সালাম বললেন, গরমতো, তাই আমরা এবার কোম্পানি কাবলি বাজারে আনে নাই।
পাঞ্জাবির জন্য রাজধানীর যেসব বিপণিবিতান প্রসিদ্ধ, তার একটি সিদ্ধেশ্বরীর আয়েশা শপিং কমপ্লেক্স। সেখানে গতকাল বুধবার বেশ ভিড় দেখা গেল। সেখানে কথা হচ্ছিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মুহসিম আবিরের সঙ্গে। বাবা, শ্বশুর ও নিজের জন্য পাঞ্জাবি দেখছেন বলে জানালেন তিনি। আবির বললেন, ঘুরে দেখছি। মনে মনে দুই দোকানে দুটো পছন্দও করেছি। আরেকটা পছন্দ হলে তিনটাই নিয়ে নেব। এবার বেচাকেনা ভালো না বলে খেদ প্রকাশ করছিলেন এ বিপণিবিতানের দোকান নাইট ফ্যাশনর ব্যবস্থাপক রকিবুল হাসান খান। তিনি বলেন, আমাদের এখানে ছোট-বড় সবার পাঞ্জাবি পাবেন ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকার ভেতর; আর কাবলি সেট ১৫০০ টাকার ভেতর। কিন্তু এইবার বেচাবিক্রি ভালা না। বিক্রি ভালো না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, হেইডা আল্লাহ কইবার পারবো, কিন্তু কাস্টমারতো আহে না। তবে শেষ দিকে বিক্রি বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন রকিবুল।
সুলতান পাঞ্জাবি নামের আরেকটি দোকানের বিক্রয় প্রতিনিধি সাজু বলেন, আমাদের এখানে ছোট-বড় উভয়ের পাঞ্জাবি পাবেন একহাজার থেকে তিন হাজার টাকার ভেতর। এবার গরমের কারণে আমরা কাবলি আনি নাই। এইবার বিক্রি এখনো তেমন ভালো না। সবাই আশা করছিল, ইলেকশনের পর এইবার ঈদে ভালো কেনাবেচা হবে। কিন্তু তার লক্ষণ নাই। দেখা যাক, শেষ দিকে কি হয়!
বাপ-বেটা পাঞ্জাবি সেট : আয়েশা শপিং কমপ্লেক্সর কয়েকটি দোকানে দেখা গেল, একই নকশার বড় ও ছোটদের পাঞ্জাবি জোড়ায় জোড়ায় সাজিয়ে রাখা হয়েছে, যেসবকে বাপ-বেটা পাঞ্জাবি সেট বলছেন বিক্রয় প্রতিনিধিরা। চার বছরের শিশুছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে এ বিপণিবিতানে এসছিলেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী রেজাউল করিম। তিনি বলছিলেন, বাপ-বেটা সেট বিষয়টা ভালো লেগেছে। ভাবছি, বাপ-ছেলে একই পাঞ্জাবি পড়ে ঈদ করব। এ বিপণিবিতানের দোকান আলম পাঞ্জাবির ব্যবস্থাপক রুবেল হোসেন বলেন, আয়েশা শপিং কমপ্লেক্সে দুই হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকায় মিলছে পাঞ্জাবির বাপ-বেটা সেট। তিনি বলেন, আমাদের এখানে বাচ্চাদের পাঞ্জাবি মিলছে ৭০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার ভেতর। আর বড়দের পাঞ্জাবি পাবেন ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকার ভেতর। একই ডিজাইনের দুই সাইজের দুটোর দাম সমন্বয় করেই বাপ-বেটা সেটের দাম। নির্ধারণ করা হয়েছে।
ফুটপাতেও মিলছে পাঞ্জাবি : ঈদ উপলক্ষে রাজধানীর মৌচাক মার্কেটের আশপাশের এলাকায় নিউ সার্কুলার রোডের পাশে বেশ কিছু অস্থায়ী দোকানে নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। সেখানে একটি অস্থায়ী দোকানে রঙ-বেরঙের পাঞ্জাবি নিয়ে বসেছিলেন সুমন শেখ। তিনি বলেন, আমার এইখানে পাঞ্জাবি পাবেন ৪০০ থেকে ২০০০ হাজার টাকার মধ্যে। ছোটগোডা পাবেন ২৫০ থেকে ৭০০ টাকায়। নি¤œবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা এ ধরনের দোকানে কম দামে ভালো পণ্য’নেওয়ার জন্য আসেন মন্তব্য করে সুমন বললেন, এইবার বেচা বিক্রিভালো না। শেষ দিকে কি হয় আল্লাহই জানেন।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারেও রাস্তার ধারে নানা পণ্যের পসরা নিয়ে বসেছে বেশকিছু অস্থায়ী দোকান। সেখানে বিভিন্ন নকশার পাঞ্জাবি বিক্রির জন্য এনেছেন সিয়াম হোসেন। তিনি বলেন, আমাগো এইখানে বড়গো পাঞ্জাবি পাবেন ৫০০ থেইকা ১০০০ টাকার ভেতর, আর ছোটগোডা পাবেন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। নি¤œবিত্তের রুচি মাথায় রেখেই পাঞ্জাবি আনার কথা জানিয়ে সুমন বলেন, আমাগো কাস্টমার গরিব মানুষ, হেরা শ্যাষ দিকে ভালো কিনে, শ্যাষ দিকে ট্যাকাটুকা পায়তো তাই।