সুমন, মনিরামপুর (যশোর) : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে যশোর-খুলনার ভবদহ এলাকায় দশকের পর দশক ধরে জলাবদ্ধতা মানুষের জীবন-জীবিকা স্থবির করে রেখেছে। ১৯৬০-এর দশকে ভবদহে ২১-বেল্ট স্লুইসগেট নির্মাণ করে কৃষি জমি লবণাচ্ছন্নতা থেকে রক্ষা করা হয়েছিল। প্রথম দিকে ফসল ফললেও কয়েক দশকের মধ্যে নদীতে পলি জমতে জমতে নাব্যতা কমে যায়, যেহেতু প্রকৃতিক জোয়ার-ভাটা বন্ধ হয়ে পড়ে। ১৯৮০-এর দশকে দেখেছে, ভ্রাম্যমান বৃষ্টি নামতে না পেরে হাজার হাজার হেক্টর জমি স্থায়ী জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিনের অনেক উদ্যোগ যেমন খনন, পানিপাম্প, নালার সংযোগ সবই সাময়িক স্বস্তি দিয়েছিল, কিন্তু পুনরায় পলি জমার কারণে স্থায়ী সমাধান হয়নি। একাধিক সরকারি প্রকল্প নিয়েও সমস্যার সমাধান হয়নি।
১৯৯০-র দশকে বিশ্বব্যাংক এডিবি সহায়তায় চালু খুলনা-যশোর ড্রেনেজ পুনর্বাসন প্রকল্প (কঔউজচ) অর্থবর্বর ছিল, তবুও প্রকল্পকারীদের জোয়ারাধার (ঞজগ) সমন্বিত কৌশল না থাকায় কৃষকরা সমর্থন করেনি। এডিবি’র পর্যালোচনায় প্রকাশ পেয়েছে, খরচ সত্ত্বেও প্রকল্প “প্রায় অকার্যকর” প্রমাণিত হয়েছে।
সম্প্রতি খননের কাজের উদ্বোধনকালে বাংলাদেশের পরিবেশমন্ত্রী রিজওয়ানা হাসান বলেন, এটি গভীর চ্যালেঞ্জ, সরকারের বহু সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পরও চুড়ান্ত সমাধানের জন্য সকলে মিলে কাজ করতে হবে। তবে প্রকৌশলগত বিশ্লেষকরা বলছেন, খনন-জলাবদ্ধতা প্রতিকার একতিমাত্র নয়। নদীর স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটা ফেরাতে ‘টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট’ (টিআরএম) অপরিহার্য।
এক স্থানীয় আন্দোলনকর্মী উল্লেখ করেছেন, “নিকাশের জন্য টিআরএম ছাড়া খনন করলে সব পয়সা-শ্রম বৃথা হবে, তিন মাসের মধ্যে আবারই পলি জমে যাবে”। প্রকৌশলীরা বলছেন, নদীতে খনন করার পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ না করলে পুনঃপলি জমাকে মোকাবিলা করা যাবে না।
“পাম্পে পানি বাহির করে খাল পরিষ্কার করলেই সাময়িক উপশম পাওয়া যায়, কিন্তু অন্তর্নিহিত সমাধান দরকার; তাই টিআরএম হওয়া আবশ্যক”। স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়েছে। প্রায় ১০ লাখ মানুষ ক্রমাগত ডুবে থাকা এলাকায় বসবাস করে। শিক্ষার্থী থেকে কৃষক, দুঃসময়ে কাঁঠাল” ফলতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকেই। স্কুল বন্ধ আর ফসল নষ্ট হয়ে আয়ের পথ সরু হয়ে গেছে।
স্কুল শিক্ষক উৎপল বিশ্বাসের মতো স্থানীয় নেতারা অভিযোগ করেন, প্রকল্পের কাজ করার জন্য বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ঐক্যমত্যের অভাব প্রকৃত সমস্যার বড় কারণ। তিনি বলেন, “সবাই যদি সহযোগিতা করতো, এই ভয়াবহতা এ পর্যায়ে আসত না; নেতারা উন্নয়ন না করে মাটি-বণ্টন আর ক্ষমতার লড়াই নিয়ে ব্যস্ত।
লক্ষ্য করা গেছে কয়েক বছর আগে আবদ্ধ ২১-বেল্ট স্লুইসগেটের অনেক খুঁটিনাটি গেট খোলা থাকলেও স্থানীয় নীতিনির্ধারকরা সুবিধামত সেই চাবিকাঠি ব্যবহার করেননি বলে অভিযোগ আছে। প্রতিবন্ধকতা ও সমাধান: প্রকল্প প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক হলেও বাস্তবায়নে শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বার্থও জড়িত।
সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, কোথায় খনন হবে, কার জমি উচ্ছেদ হবে এ নিয়ে অনেক সময় স্থানীয় নেতাদের আর্থ-রাজনৈতিক প্রভাব প্রকৌশলগত চাহিদাকে পিছনে ফেলে দেয়। যেমন শিকার বিশ্বাসের কথা: “টিআরএম চালানো ছাড়া খননের অর্থ ও শ্রমটা বৃথাই যাবে”।
এছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে মৎস্যচাষিরা নোনাজলাশষের সুফল নিয়ে লাভবান হলেও কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত, আর কিছু রাজনৈতিক-আর্থিক গোষ্ঠী প্রকৃত সমাধানকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই সংকট শুধু প্রকৌশল নয়, রাজনৈতিক সংকল্পের ব্যাপার। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিম্নলিখিত ব্যবস্থা নিতে হবে: সমন্বিত পরিকল্পনা অনুযায়ী টিআরএম সহ পদক্ষেপ: খনন কাজের পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে কয়েকটি খালের মাধ্যমে নদী ও বিলকে যুক্ত করে জোয়ার-ভাটা ফিরিয়ে আনতে হবে।