চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর আবারও রক্তচাপ বাড়ানো উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। গভীর রাতে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীরা যৌথ বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পে অতর্কিত হামলা চালিয়ে গুলী বর্ষণ, ককটেল বিস্ফোরণ এবং বুলডোজার দিয়ে ক্যাম্পের দেয়াল ও অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটিয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যাতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারেন, সে উদ্দেশ্যে অন্তত তিন থেকে চারটি স্থানে রাস্তা ও কালভার্ট কেটে বিচ্ছিন্ন করা হয় পুরো এলাকা।

রোববার দিবাগত রাত একটার পর থেকে সীতাকু-ের জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। র্যাব, পুলিশ, এপিবিএন ও আরআরএফ সদস্যদের সমন্বয়ে পরিচালিত যৌথ বাহিনী পরে অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। কয়েকজন সন্ত্রাসীকে আটক করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে র্যাব।

পরিকল্পিত হামলার অভিযোগ : র্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, পরিকল্পিতভাবে ‘ইয়াসিন বাহিনী’র সদস্যরা র্যাব ক্যাম্পে হামলা চালিয়েছে। গভীর রাতে চারদিক থেকে ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলী ছোড়া হয়। আত্মরক্ষার্থে র্যাব সদস্যরাও পাল্টা গুলী চালান।

তিনি বলেন, “সন্ত্রাসীরা আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রাস্তা কেটে দেয়, যাতে অতিরিক্ত ফোর্স দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারে। এরপরও যৌথ বাহিনীর সদস্যরা সব বাধা অতিক্রম করে সেখানে পৌঁছে অভিযান পরিচালনা করেন।”র্যাবের দাবি, হামলার সময় সন্ত্রাসীরা ক্যাম্পের দেয়াল ও বিভিন্ন স্থাপনা বুলডোজার ও এক্সক্যাভেটর দিয়ে ভেঙে ফেলে। কিছু সন্ত্রাসী পালিয়ে গেলেও বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।

দুই ঘণ্টাব্যাপী গুলীবিনিময় : র্যাব সূত্র জানায়, রাত ১টার দিকে হামলা শুরু হয়ে প্রায় রাত ৩টা পর্যন্ত উভয়পক্ষের মধ্যে গুলীবিনিময় চলে। হামলাকারীরা আগ্নেয়াস্ত্রের পাশাপাশি ককটেলের বিস্ফোরণও ঘটায়। যৌথ বাহিনীর সদস্যরা শর্টগান, চাইনিজ রাইফেল ও গ্যাস গান ব্যবহার করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, “নতুন ক্যাম্প নির্মাণ ঠেকাতেই হামলা চালানো হয়েছে। হামলাকারীরা চেয়েছিল বাহিনীর সদস্যরা যেন ক্যাম্প থেকে বের হতে না পারেন। কিন্তু কঠোর প্রতিরোধের কারণে তারা ক্যাম্পে প্রবেশ করতে পারেনি।”তিনি জানান, পুরো ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে ১০৪ রাউন্ড গুলী ছোঁড়া হয়েছে। তবে বাহিনীর কোনো সদস্য হতাহত হননি।

রাস্তা কেটে বিচ্ছিন্ন করা হয় এলাকা : হামলার অন্যতম কৌশল ছিল বিভিন্ন স্থানে রাস্তা ও কালভার্ট কেটে দেওয়া। ফলে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপক বেগ পেতে হয়। অনেক স্থানে গাড়ি রেখে পায়ে হেঁটে অভিযান চালাতে হয়েছে। র্যাব কর্মকর্তা কামাল হোসেন নিজের ফেসবুক আইডিতে প্রকাশিত ভিডিও বার্তায় বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাতে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন স্থানে রাস্তা ও কালভার্ট কেটে দিয়েছে। তারা ভেবেছিল আমরা পরাজিত হবো। কিন্তু আমরা আরও কৌশলীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছি।”ভিডিওতে দেখা যায়, পাহাড়ি পথে বড় বড় গর্ত তৈরি করে যান চলাচল অযোগ্য করে ফেলা হয়েছে। কিছু স্থানে রাস্তার অংশ ধসে ফেলা হয়েছে, যাতে ভারী যানবাহন প্রবেশ করতে না পারে।

আতঙ্কে স্থানীয় বাসিন্দারা : রাতভর গোলাগুলী ও বিস্ফোরণের ঘটনায় জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গভীর রাতে হঠাৎ গোলাগুলীর শব্দে তারা ঘর থেকে বের হতে পারেননি। পাহাড়ি এলাকায় আতঙ্কজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়। একাধিক বাসিন্দা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যু গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকায় সাধারণ মানুষ সবসময় ভয়ের মধ্যে বসবাস করেন। সাম্প্রতিক যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও নতুন করে হামলার ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে।

জঙ্গল সলিমপুর কেন গুরুত্বপূর্ণ : চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক ধরে পাহাড়ি পথ পেরিয়ে জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশ করতে হয়। আলীনগর ও ছিন্নমূল-এই দুই অংশে বিভক্ত পুরো এলাকাজুড়ে রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাসজমি। দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে এলাকাটি বিভিন্ন ভূমিদস্যু, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও অবৈধ দখলদার গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পাহাড় কেটে এখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ বসতি, দোকানপাট ও মার্কেট। সরকারি সূত্র বলছে, এ এলাকায় কারাগার, আইটি পার্কসহ ১১টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু অবৈধ দখল ও সন্ত্রাসী নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।

৯ মার্চের ঐতিহাসিক অভিযান : গত ৯ মার্চ জঙ্গল সলিমপুরে দেশের অন্যতম বড় যৌথ অভিযান পরিচালনা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তৎকালীন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি এবং বর্তমানে র্যাবের মহাপরিচালক মো. আহসান হাবীব পলাশের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানে অংশ নেয় সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ, বিজিবি, এপিবিএনসহ বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৩ হাজার ১৮৩ সদস্য। তিনটি হেলিকপ্টার ব্যবহার করে পরিচালিত অভিযানে ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিন, রোকন বাহিনীর প্রধান রোকন উদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী এখনো পলাতক। এর আগে চারবার অভিযান চালানোর চেষ্টা করেও সফল হতে পারেনি প্রশাসন। বরং বিভিন্ন সময় হামলার শিকার হন পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

র্যাব কর্মকর্তার নিহত হওয়ার পর উত্তপ্ত এলাকা : গত ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাবের উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন নিহত হন। একই ঘটনায় আরও তিন র্যাব সদস্য ও এক সোর্স আহত হন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, ওই ঘটনার পর থেকেই জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে কঠোর অবস্থানে যায় প্রশাসন। পরবর্তীতে যৌথ বাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সেখানে অস্থায়ী পুলিশ ও র্যাব ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।

‘পিছু হটার সুযোগ নেই’: সোমবার সকালে অভিযানে গিয়ে জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, “জঙ্গল সলিমপুরে যত ঝাঁকুনি দিক, আমাদের পিছু হটার সুযোগ নেই। ইয়াসিন, রোকন বা যারাই জড়িত থাকুক, সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।” তিনি আরও বলেন, “জঙ্গল সলিমপুরে কোটি কোটি টাকার স্বার্থ জড়িত। সেই আধিপত্য ধরে রাখতেই সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছে। দ্রুত সড়ক নির্মাণ ও স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এলাকার ৮০ শতাংশ সমস্যা সমাধান হবে।”

‘দুর্গম এলাকার সুযোগ নিচ্ছে সন্ত্রাসীরা’ : র্যাব-৭-এর অধিনায়ক হাফিজুর রহমান বলেন, পাহাড়ি দুর্গম এলাকা হওয়ায় সন্ত্রাসীরা বারবার পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তিনি বলেন, “বারবার হামলা করলেও প্রশাসন পৌঁছাতে দেরি হয়। কারণ তারা আগে থেকেই রাস্তা বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তবে এবার আমরা আরও তৎপর হচ্ছি। খুব দ্রুত সব সন্ত্রাসীকে আইনের আওতায় আনা হবে।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, জঙ্গল সলিমপুরে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা না করা গেলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের সশস্ত্র প্রতিরোধ ও হামলার ঘটনা ঘটতে পারে। তাই সেখানে স্থায়ী ক্যাম্প, সড়ক উন্নয়ন এবং সন্ত্রাসবিরোধী ধারাবাহিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।