নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও জঙ্গীবাদ ইস্যুকে সামনে এনে নতুন এক ন্যারেটিভ তৈরির অপচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার যেভাবে বিরোধী মত, ইসলামী শক্তি এবং ভিন্ন রাজনৈতিক ধারাকে দমন করতে জঙ্গী তকমাকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল, এখন সেই পুরোনো কৌশল আবারও সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে।

সম্প্রতি দেশের সব বিমানবন্দরে জঙ্গী হামলার সম্ভাব্য সতর্কতা জারি এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের ঘটনা নতুন করে এই বিতর্ককে সামনে এনেছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের সব বিমানবন্দরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার সতর্কবার্তার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাড়তি সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (কনফিডেনসিয়াল) কামরুল আহসানের সই করা এক দাপ্তরিক চিঠিতে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সতর্কতা জারি করা হয়। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি জঙ্গী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে এবং তারা দেশের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে সমন্বিত হামলার পরিকল্পনা করতে পারে বলে গোয়েন্দা তথ্যে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিমানবন্দর, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা এবং কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোকে বাড়তি নজরদারির আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এমন নিরাপত্তা সতর্কতা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে। তবে একই সঙ্গে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে এটিও মনে রাখতে হবে যে, জঙ্গীবাদ ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার প্রবণতা বাংলাদেশে নতুন নয়। প্রকৃত নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আতঙ্ক তৈরির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকা জরুরি। কারণ বাস্তব হুমকি মোকাবিলার আড়ালে যদি আবারও পুরোনো রাজনৈতিক ন্যারেটিভ সক্রিয় করার চেষ্টা হয়, তাহলে তা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য আরও ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে এই একই কৌশল ব্যবহার করে জনগণের ভোটাধিকার হরণ, গুম-খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- এবং বিরোধী মত দমনের মতো কর্মকা-কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। জঙ্গী দমন এর নামে বহু নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছেন, বহু পরিবার ধ্বংস হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অংশকে ব্যবহার করে ভয় ও আতঙ্কের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বহুবার অভিযোগ করেছে যে, জঙ্গীবাদবিরোধী অভিযানের নামে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল। কিন্তু তখন রাষ্ট্রীয় প্রচারণা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, অনেক সত্য চাপা পড়ে যায়। বর্তমানে জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বেশি। তাই পুরোনো সেই ন্যারেটিভ সহজে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এখন মানুষ বুঝতে শিখেছে-জঙ্গী তকমা অনেক সময় শুধু নিরাপত্তা ইস্যু নয়, বরং ক্ষমতা ধরে রাখার একটি কৌশলও হতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বি: জে: মোহাম্মদ হাসান নাসির (অব.) বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যখন দেশে কার্যত কোনো পুলিশ বাহিনী কার্যকর ছিল না, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি টালমাটাল ছিল এবং দীর্ঘদিন ইন্টারিম গভর্নমেন্ট দায়িত্বে ছিল, তখন কোথাও জঙ্গি তৎপরতার বাস্তব চিত্র দেখা যায়নি। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই দেশে জঙ্গি গোষ্ঠীর সক্রিয় হওয়ার খবর সামনে আনা হচ্ছে। এটি অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ।”

তিনি আরও বলেন, “আওয়ামী লীগের পুরোনো রাজনৈতিক প্রকল্পই ছিল জঙ্গি ইস্যুকে ব্যবহার করে বিরোধী শক্তিকে চাপে রাখা এবং আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের প্রয়োজনীয় হিসেবে উপস্থাপন করা। সেই একই কৌশল আবারও সামনে আনার চেষ্টা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের এই জঙ্গি প্রকল্প বিএনপিকে ঘিরে সফল হতে দেওয়া হবে না।”

তিনি দাবি করেন, “দেশে জঙ্গিবাদের ভয় দেখিয়ে অতীতে বহুবার রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন দেশের মানুষ অনেক সচেতন। তারা বুঝে গেছে—এটি একটি পুরোনো রাজনৈতিক স্ক্রিপ্ট। তাই আওয়ামী লীগের এই পুরোনো ন্যারেটিভ জনগণ আর বিশ্বাস করে না।”

বি:জে: হাসান নাসির আরও বলেন, “আওয়ামী স্টাইলে ভয়, দমন-পীড়ন এবং জঙ্গি তকমার রাজনীতি করে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারবে না। জনগণ এখন একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা চায়। সেই বাস্তবতা থেকে দৃষ্টি সরাতেই নতুন করে জঙ্গি আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা চলছে।”

এ বিষয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, “শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন বিদেশিদের সন্তুষ্ট রাখতে এবং নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে জঙ্গী নাটক সাজিয়েছেন। জঙ্গীবাদকে তিনি শুধু নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করে নিজেকে ‘অপরিহার্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ছিল তার কৌশলের অংশ।”

তিনি বলেন, “এখন বিএনপিও যদি একইভাবে নতুন করে জঙ্গী নাটক সাজানোর পথে হাঁটে, তাহলে সেটি হবে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের মুসলমানদের সন্দেহের চোখে দেখে, অনেক ক্ষেত্রেই সকল মুসলিমকে জঙ্গীবাদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রবণতা রয়েছে। সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে শক্তিশালী করার মতো কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ দেশের জন্য শুভ হতে পারে না।”

ড. দিলারা চৌধুরী আরও বলেন, “দেশে এখন অর্থনৈতিক চাপ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব, প্রশাসনিক অস্থিরতা, গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রয়োজনসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা রয়েছে। কিন্তু সেসব বাস্তব সংকট থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আবারও জঙ্গী ইস্যুকে সামনে আনা হলে জনগণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হবে।”

তার মতে, জনগণ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। তারা জানতে চায়-বাস্তব সমস্যার সমাধান না করে কেন বারবার ‘জঙ্গী আতঙ্ক’কে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে আনা হচ্ছে। এ কারণেই জঙ্গী ইস্যুতে নতুন করে রাজনৈতিক প্রচারণা সাধারণ মানুষের কাছেও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে।