নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রাম জেলার স্বাস্থ্য বিভাগে স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদকে ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম অভিযোগ উঠেছে। জেলার ১৫টি উপজেলার মধ্যে অন্তত ৯টিতে পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো তালিকায় ৮টি উপজেলায় বিভিন্ন ব্যক্তিকে কর্মরত দেখানো হয়েছে। এদের অধিকাংশই মূলত স্বাস্থ্য সহকারী পদে কর্মরত হলেও নানা কৌশলে স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের দায়িত্ব ধরে রেখেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্যও বড় ধরনের হুমকি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৯ মার্চ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের একটি তালিকা পাঠানো হয়। তালিকাটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাস্তবে স্থায়ী স্যানিটারি ইন্সপেক্টর না থাকলেও বিভিন্ন উপজেলায় কয়েকজনকে ওই পদে কর্মরত দেখানো হয়েছে। তাদের অধিকাংশই স্বাস্থ্য সহকারী হলেও ‘নিজ বেতনে’ স্যানিটারি ইন্সপেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এদের মধ্যে অন্তত আটজন নিয়মতান্ত্রিক পদোন্নতি ছাড়াই এ পদে বহাল রয়েছেন।

স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, স্থায়ী স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের পদ বহুদিন ধরে শূন্য রয়েছে। কিন্তু সেই শূন্যতা আড়াল করতে এবং নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে সুবিধা দিতে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তিকর তালিকা পাঠানো হয়েছে।

তাদের অভিযোগ, জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা এই অনিয়মে সক্রিয়ভাবে জড়িত। নিয়মবহির্ভূতভাবে স্বাস্থ্য সহকারীদের স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদে দায়িত্ব দিয়ে পরে সেটিকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী, স্বাস্থ্য সহকারী থেকে স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতির জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা থাকা বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে রয়েছে-স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে ন্যূনতম সাত বছরের অভিজ্ঞতা, এইচএসসি পাস এবং স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে স্যানিটারি ইন্সপেক্টরশিপ বিষয়ে তিন বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা সনদ। এছাড়া নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জমা দিতে হয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জ্যেষ্ঠতার তালিকা অনুযায়ী ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি দিয়ে থাকে।

অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে যারা এ পদে কর্মরত দেখানো হচ্ছেন, তাদের অধিকাংশেরই এসব যোগ্যতা নেই। ফলে তারা নিয়মতান্ত্রিক পদোন্নতির মাধ্যমে নয়, বরং প্রশাসনিক ফাঁকফোকর ও আদালতের প্রক্রিয়া ব্যবহার করে পদটি ধরে রেখেছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অনিয়ম শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ স্যানিটারি ইন্সপেক্টররা মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়ন, খাদ্য নিরাপত্তা তদারকি এবং সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সেখানে অযোগ্য ব্যক্তিরা দায়িত্ব পালন করলে সেবার মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চাইলে তাদেরকে স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদে নিয়োগ দিতে পারে। জেলায় যেসব পদে যেভাবে কর্মরত আছেন, তা তুলে ধরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এখন সিদ্ধান্ত নেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।”

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো এই তালিকা নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং প্রকৃত শূন্য পদগুলোতে যোগ্য ও প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।