চট্টগ্রামে ২০২৬-২৭ মৌসুমে আউশ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২৬ হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে বিনামূল্যে বীজ ও সার সহায়তা দেওয়া হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত এই প্রণোদনা কর্মসূচির মাধ্যমে জেলার বিভিন্ন উপজেলার কৃষকদের মাঝে উন্নতমানের আউশ বীজ ও রাসায়নিক সার বিতরণ করা হয়। সরকারের এই উদ্যোগে কৃষি উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২০২৬-২৭ মৌসুমে আউশ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই প্রণোদনা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। কর্মসূচির আওতায় জেলার ১৫টি উপজেলার মোট ২৬ হাজার কৃষক সরাসরি উপকারভোগী। এসব কৃষকের প্রত্যেকে এক বিঘা আউশ জমির জন্য বিনামূল্যে ৫ কেজি উফশী বীজ, ১০ কেজি এমওপি সার এবং ১০ কেজি ডিএপি সার পেয়েছেন।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এই প্রণোদনার মূল লক্ষ্য হলো আউশ চাষে কৃষকদের আগ্রহ বৃদ্ধি, অনাবাদি জমিকে চাষের আওতায় আনা, উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো এবং কৃষকের আর্থিক চাপ কমানো। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা যাতে সহজে আউশ চাষে অংশ নিতে পারেন, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে।

উপজেলাভিত্তিক বরাদ্দ অনুযায়ী মিরসরাই উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ৩ হাজার ৫০০ কৃষক এই সহায়তা পেয়েছেন। এখানে আউশ জমির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ২৭০ হেক্টর। এর মধ্যে হাইব্রিড ও উফশী জাতের আউশ চাষে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সীতাকু- উপজেলায় ৩ হাজার ২০০ কৃষককে প্রণোদনার আওতায় আনা হয়েছে। এ উপজেলায় আউশ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ৪ হাজার ৬২০ হেক্টর। ফটিকছড়ি উপজেলায় ২ হাজার ৫০০ কৃষক সহায়তা পান এবং এখানকার আউশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ হাজার ৫০০ হেক্টর নির্ধারণ করা হয়েছে।

হাটহাজারী উপজেলায় ৮০০ কৃষক, রাউজানে ৮০০ কৃষক এবং রাঙ্গুনিয়ায়ও ৮০০ কৃষককে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে। এসব এলাকায় তুলনামূলক কম জমিতে আউশ চাষ হলেও কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়াতে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

বোয়ালখালী উপজেলায় ২০০ কৃষককে প্রণোদনা দেওয়া হয়। পটিয়া উপজেলায় ১ হাজার ১০০ কৃষক সহায়তা পান, যেখানে আউশ জমির লক্ষ্যমাত্রা ৫২০ হেক্টর। কর্ণফুলী উপজেলায় ১০০০ কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও সেখানে আউশ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ৩২০ হেক্টর। আনোয়ারা উপজেলায় ৩ হাজার ২৬০ কৃষককে সহায়তা দেওয়া হয়, যা জেলার অন্যতম বড় বরাদ্দ। চন্দনাইশ উপজেলায় ২ হাজার ২০০ কৃষক এবং লোহাগাড়ায় ১ হাজার ২০০ কৃষক এই সুবিধা পেয়েছেন।

সাতকানিয়ায় ১ হাজার ৯০০ কৃষক, বাঁশখালীতে ২ হাজার ৩০০ কৃষক এবং সন্দ্বীপ উপজেলায় ২ হাজার ৫০০ কৃষককে এই প্রণোদনার আওতায় আনা হয়েছে। উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে এসব এলাকায় বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে বলে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে।

জেলার মোট আউশ জমির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৪ হাজার ৩০০ হেক্টর। এর মধ্যে হাইব্রিড আউশের জন্য ৫ হাজার ৭০ হেক্টর, উফশী আউশের জন্য ২৫ হাজার ৭৩০ হেক্টর এবং স্থানীয় জাতের জন্য ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমি নির্ধারণ করা হয়েছে।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, আউশ মৌসুমে সময়মতো বীজ ও সার সরবরাহ করায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। প্রণোদনা কর্মসূচির ফলে কৃষকেরা উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারে উৎসাহিত হবেন এবং ফলনও বাড়বে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত উৎপাদন দেশের খাদ্য মজুত শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।

তারা আরও জানান, জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টি এবং উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির কারণে কৃষকেরা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি সহায়তা কৃষকদের জন্য বড় স্বস্তি হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে প্রান্তিক কৃষকেরা সরাসরি লাভবান হবেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক আপ্রু মারমা বলেন, চট্টগ্রামের মতো কৃষি সম্ভাবনাময় জেলায় নিয়মিত এ ধরনের প্রণোদনা কার্যক্রম চালু থাকলে কৃষিতে নতুন গতি আসবে। শুধু ধান উৎপাদন নয়, কৃষকের জীবনমান উন্নয়নেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সরকারের এই উদ্যোগকে কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর একটি বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। বিনামূল্যে বীজ ও সার সহায়তা পেয়ে কৃষকেরা নতুন উদ্যমে মাঠে নামবেন এবং চলতি মৌসুমে আউশ উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক আপ্রু মারমা।