গাজীপুরের শ্রীপুরে বাল্যবিবাহ ঠেকানোর নামে নিকাহ রেজিস্ট্রার ও সাধারণ মানুষকে হয়রানি এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নারী ও শিশু কল্যাণ সমিতির সভাপতি ও উপজেলা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির সদস্য মো. মেহেদী হাসান আশিকের বিরুদ্ধে। অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্তে নেমেছে উপজেলা প্রশাসন।
লিখিত অভিযোগে কয়েকজন নিকাহ রেজিস্ট্রার দাবি করেছেন, বাল্যবিবাহ বন্ধের কথা বলে তাঁদের পথে আটকে নিকাহ রেজিস্ট্রেশনের ভলিউম বা রেজিস্টার নিয়ে নেওয়া এবং তা ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ দাবি করা হয়েছে। অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রশাসনিকভাবে হয়রানি ও পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া বিয়ে বন্ধ করে দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পরিবারের সঙ্গে অর্থ লেনদেন, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও আনা হয়েছে। একই সঙ্গে মেহেদী হাসান আশিকের নেতৃত্বাধীন সংগঠনের নিবন্ধন, অনুমোদন ও আর্থিক কার্যক্রম এবং তাঁর দৃশ্যমান সম্পদের উৎস তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগের বিষয়ে গত ২৯ জুন শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি তদন্তের জন্য উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউএনও নাহিদ ভূঁইয়া।
কাজিদের রেজিস্টার আটকে অর্থ দাবির অভিযোগ
লিখিত অভিযোগে কয়েকজন নিকাহ রেজিস্ট্রার দাবি করেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় তাঁদের ও তাঁদের সহকারীদের আটকে নিকাহ রেজিস্ট্রেশনের ভলিউম বা রেজিস্টার নিয়ে নেওয়া হতো। পরে রেজিস্টার ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ দাবি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রশাসনিকভাবে হয়রানি কিংবা পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার ভয় দেখানো হতো বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
বিয়ে বন্ধের পর অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো মেয়ের বিয়ে বন্ধ করে দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পরিবারের সঙ্গে গোপনে অর্থ লেনদেনের ঘটনা ঘটত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কথিত প্রেমিক পক্ষ বিয়ে বন্ধ করার জন্য অর্থ দিলেও মেয়েটি নিজে বিয়েতে সম্মত ছিল—এমন অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
সংগঠনের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন
মেহেদী হাসান আশিকের নেতৃত্বাধীন শ্রীপুর উপজেলা নারী ও শিশু কল্যাণ সমিতির নিবন্ধন, অনুমোদন, আয়-ব্যয়, ব্যাংক হিসাব, দাতাদের তথ্য এবং বিভিন্ন কর্মসূচির অর্থের উৎস যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
সম্পদের উৎস তদন্তের দাবি
অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, মেহেদী হাসান আশিকের নামে বা তাঁর নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন এলাকায় জমি ও বাড়ি রয়েছে। কোথাও কোথাও ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে বাড়ি নির্মাণের কথাও তাঁরা উল্লেখ করেছেন।
তবে এসব সম্পদ বৈধ আয়ের মাধ্যমে অর্জিত কি না, সে বিষয়ে কোনো সরকারি তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেন, জমির দলিল ও সম্পদের ঘোষণার সঙ্গে দৃশ্যমান সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
জমি বিরোধে হামলার অভিযোগ
এদিকে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে মেহেদী হাসান আশিক ও তাঁর স্বজনদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগও করেছেন শ্রীপুর উত্তরপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. রিয়াজ উদ্দিন।
শ্রীপুর মডেল থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে রিয়াজ উদ্দিন দাবি করেন, গত ১২ জুন রাত আনুমানিক ৮টার দিকে লাঠিসোঁটা নিয়ে তাঁদের বাড়িতে প্রবেশ করে তাঁর বাবা কাজল মিয়াকে মারধর করা হয়। তাঁকে উদ্ধারে এগিয়ে গেলে তাঁর মা মজিদাকেও মারধর ও চুলের মুঠি ধরে টানাহেঁচড়া করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং সরকারি কমিটি বা প্রশাসনের নাম ব্যবহার করে যাতে কেউ সাধারণ মানুষ ও নিকাহ রেজিস্ট্রারদের হয়রানি বা অর্থ আদায় করতে না পারে, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
শ্রীপুর উপজেলা সচেতন নাগরিক সমাজের সভাপতি জুয়েল রানা বলেন, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ সত্য হলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উদ্যোগের আড়ালে ব্যক্তিগত স্বার্থে প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
আশিকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
মেহেদী হাসান আশিকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদ ভূঁইয়া বলেন, “লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্তের জন্য উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের নামে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন যদি নিজের ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি বা অর্থ আদায়ের চেষ্টা করে থাকে, সেটিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।”