শিবালয় (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা : মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাট-সংলগ্ন টার্মিনাল থেকে রাজধানীর গাবতলী ও গুলিস্তান রুটে দিনে চারটি পরিবহন কোম্পানির ৪৭০টি বাস চলাচল করে। এসব বাস থেকে মাসে ৩৩ লাখ টাকার বেশি

চাঁদা তোলা হচ্ছে। প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় ‘ঘাট সুপারভাইজার’ নামের কিছু ব্যক্তি এ চাঁদা তুলছেন। এর বাইরে পার্কিংয়ের নামে নেয়া হচ্ছে বাসপ্রতি ৫০ টাকা।

পাটুরিয়া ঘাট থেকে ৬৩ কিলোমিটার দূরের রাজধানীতে যাতায়াত করে সেলফি, নীলাচল, পদ্মা লাইন ও যাত্রীসেবা পরিবহনের বাস। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন সেলফি পরিবহনের গড়ে ৩০০টি বাস, নীলাচল পরিবহনের ১২০টি, পদ্মা লাইনের ৩০টি ও যাত্রীসেবার ২০টি বাস ঢাকা-পাটুরিয়া রুটে চলাচল করে।

বাস মালিক ও শ্রমিকরা অভিযোগ করেছেন, পাটুরিয়ায় জিপির নামে প্রতিটি সেলফি বাস থেকে প্রতিদিন ৩০০ টাকা করে প্রায় ৯০ হাজার টাকা, নীলাচল থেকে ১০০ টাকা করে ১২ হাজার টাকা, পদ্মা লাইন থেকে ১০০ টাকা করে তিন হাজার টাকা এবং যাত্রীসেবার বাস থেকে ২০০ টাকা করে চার হাজার টাকা চাঁদা তুলছেন সংশ্লিষ্ট ঘাট সুপারভাইজাররা। স্বাভাবিক সময়ে এ হারে চাঁদা নেওয়া হলেও ঈদের সময় তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।

বাস মালিকরা বলছেন, বিপুল পরিমাণ অর্থ এভাবে দিতে বাধ্য হওয়ায় তাদের ব্যবসায় চাপ তৈরি হয়। চাঁদা দিতে না হলে হয়তো বাস ভাড়া কমানো যেত। চালক-শ্রমিকদের বেতনও বাড়ানো যেত। চালক-শ্রমিকরা বলছেন, চাঁদা তোলার সঙ্গে জড়িতরা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তারা নানাভাবে চাপের মধ্যে থাকেন।

২০২৪ সালে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পাঁচ-ছয় মাস পাটুরিয়া ঘাটে বিভিন্ন বাস থেকে জিপির নামে চাঁদা নেয়া বন্ধ থাকলেও এই উৎপাত আবার শুরু হয়েছে। পাটুরিয়া ঘাটে ৫ আগস্টের পর মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠনের কার্যক্রম নেই। কিন্তু বন্ধ হয়নি চাঁদাবাজি।

পাটুরিয়ায় লঞ্চ ঘাটের কাছেই বিআইডব্লিউটিএর বাস টার্মিনাল। সেখানে বিভিন্ন কোম্পানির বাস চলাচল যারা নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের স্থানীয়ভাবে ঘাট সুপারভাইজার বলা হয়। মূলত তারাই পার্কিং ও সিরিয়াল দেওয়াসহ বিভিন্ন নামে বাসগুলো থেকে চাঁদা তোলেন।

সূত্র জানায়, সেলফি বাস থেকে চাঁদা তোলেন এ পরিবহন কোম্পানির পাটুরিয়া ঘাট সুপারভাইজার সুলতান আহমেদের নেতৃত্বে চার-পাঁচজন যুবক। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও তাঁরই নেতৃত্বে চাঁদা তোলা হতো বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন বাসের চালক ও মালিকরা।

সেলফি বাসের নিজস্ব সুপারভাইজার আরিফ শেখ, আমজাদ হোসেনসহ সাত-আটজন জানান, পাটুরিয়া ঘাটে ৩০০ টাকা করে চাঁদা দেয়া না হলে গাড়ির সিরিয়াল দেওয়া হয় না। ফলে রাস্তায় যাত্রী নিয়ে গাড়ি নামাতে চাঁদা দিতে হচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পান না বলেও জানান তারা। ঈদের সময় সেলফি পরিবহনের বাসপ্রতি ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা চাঁদা দিতে হয়।

সেলফি বাসের পাটুরিয়া ঘাট সুপারভাইজার সুলতান আহমেদ এই কোম্পানির বাস থেকে জিপির নামে ২২০ টাকা করে চাঁদা নেয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ঘাটের স্টাফদের বেতনের জন্য নেয়া হচ্ছে। এটা সবাই জানে।

নীলাচল বাসের চার-পাঁচজন চালক জানান, জিপির নামে নীলাচল বাস থেকে চাঁদা নেওয়ায় জসিম খানসহ চার-পাঁচজন যুবককে ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল পুলিশ গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। এরপর নীলাচল বাস থেকে ঘাটে চাঁদা নেয়া বন্ধ রয়েছে। তখন ৫০০ টাকা করে জিপি নামে চাঁদা নেয়া হতো। এখন তাদের শুধু পার্কিং বাবদ বাসপ্রতি ৫০ টাকা দিতে হয়। এই পরিবহনের একজন ‘ভিআইপি’ চেকার বলেন, স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধির নামে প্রতিটি নীলাচল বাস থেকে ১০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হচ্ছে। এর বাইরে পার্কিংয়ের নামে দিতে হয় ৫০ টাকা করে। পদ্মা লাইন ও যাত্রীসেবার বাস থেকেও একই চক্র চাঁদা আদায় করে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, ঘাট আমরা ইজারা নিয়েছি। আমার লোকজন প্রতিটি বাস থেকে পার্কিংয়ের জন্য ৫০ টাকা নিচ্ছে। এ ছাড়া কোনো টাকা নেয়া হয় না।

শিবালয় থানার ওসি মনির হোসেন বলেন, নীলাচল বাসে চাঁদাবাজির অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আর কেউ এ নিয়ে অভিযোগ করেননি। অন্যরা অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ বিষয়ে জানতে বিআইডব্লিউটিএর বন্দর কর্মকর্তা সুব্রত সরকারকে ফোন করলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।