খুলনার কোন উপজেলা হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ের মেশিন না থাকায় রোগীদের ভোগান্তির শেষ নেই। হাসপাতালগুলোতে অভিজ্ঞ চিকিৎসক, সেবিকা বা অন্যান্য জনবল মোটামুটি থাকলেও রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি না থাকায় রোগীদের দৌড়াতে হয় নগরীর বিভিন্ন ক্লিনিকে। তাদের পড়তে হয় দালালের খপ্পরে। পরীক্ষা নিরীক্ষার নামে সর্বশান্ত হয়ে যখন চিকিৎসকের নিকট পৌঁছায় তখন আর ওষুধ কেনার পয়সা থাকে না। উপজেলা হাসপাতাল থেকে প্রয়োজন মত ওষুধও সরবরাহ করা হয়। চিকিৎসকরা বলছেন, যে কোন হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা দিতে এক্স-রে মেশিন, আল্ট্রসাউন্ড মেশিন, সেল কাউন্টার মেশিন, সেমি অটো এ্যানালাইজার মেশিন অবশ্যই প্রয়োজন। এমনই হাসপাতাল খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সেখানে চিকিৎসক থাকলেও প্রয়োজনীয় রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতির অভাবে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা। বাধ্য হয়ে তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ১৪ কিলোমিটার দূরের খুলনা নগরীতে যেতে হচ্ছে। এতে সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া ব্যাহত হচ্ছে। একই চিত্র মেলে দাকোপ, ডুমুরিয়া, রূপসা, ফুলতলা, তেরখাদা, পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলা হাসপাতালে। দূরের এসব হাসপাতাল থেকে চিকিৎসকরা জটিল রোগীর রোগ নির্ণয়ে ব্যর্থ হয়ে বাধ্য হন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করতে। অনেক সময় কয়রা উপজেলা থেকে রোগী খুলনা পৌঁছাবার আগেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ্ জামান বলেন, সরকার গ্রাম-গঞ্জে মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর। অথচ রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জামাদি ছাড়াই খানিকটা চিকিৎসকের উপর চাপ দেয়া হয়। খানিকটা যুদ্ধাস্ত্র ছাড়াই যুদ্ধে পাঠাবার মতই। ফলে দোষ হয় চিকিৎসকের। বটিয়াঘাটা উপজেলা হাসপাতালে একটি আল্ট্রাসাউন্ড মেশিন থাকলেও নেই কোনো প্রশিক্ষিত অপারেটর। ফলে সপ্তাহে মাত্র একদিন একজন চিকিৎসক মেশিনটি চালু করেন। এছাড়া এক্সরে মেশিন, জেনারেটর, এমআরআই ও সিটি স্ক্যানের কোনো সুবিধাই এখানে নেই। ফলে চিকিৎসকরা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই রোগ নির্ণয় করছেন।
উপজেলার প্রায় সকল হাসপাতালে মাত্র চার থেকে পাঁচজন চিকিৎসকের বসার ব্যবস্থা থাকলেও বাকিদের পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। সুখদাড়া গ্রাম থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী মিহির মণ্ডল (৩০) জানান, তিনি অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ নিয়ে তিনদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। মেডিসিন কনসালটেন্ট ডা. ফরহাদুল ইসলাম তুহিন, সার্জারি কনসালটেন্ট ডা. দিব্যেন্দু সরকার চিকিৎসা দেন। ব্যথা কিছুটা কমলেও চিকিৎসক দ্রুত আল্ট্রাসনোগ্রামের পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু খুলনা শহরে গিয়ে পরীক্ষা করানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য তার নেই। তাই বাধ্য হয়ে হাসপাতালে থেকেই অপেক্ষা করছেন। একই ধরনের দুর্ভোগে পড়ছেন আরও অনেক রোগী।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অহিদুজ্জামান বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসক ও সেবিকার সংকট নেই। তবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি এবং অপারেটরের অভাবে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন প্রচুর রোগী এখানে আসেন। জটিল রোগীদের চিকিৎসা দেয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে, তাই তাদের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তিনি আরও জানান, হাসপাতালে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরও সংকট রয়েছে।
খুলনার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মিজানুর রহমান বলেন, প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে অভিজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন। রয়েছেন অভিজ্ঞ নার্স। হাসপাতাল গুলোতে এক্সরে মেশিন, আল্ট্রাসাউন্ড মেশিন, সেল কাউন্টার মেশিন, সেমি অটো এ্যানালাইজার মেশিন এসব না থাকায় রোগীদের উন্নত মানের চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয় না। রোগ নির্ণয়ের এসব যন্ত্র থাকলে জেলা হাসপাতালে রোগীর চাপ অনেকটা কমে যেত। তাছাড়া গ্রামের সাধারণ মানুষ স্বল্প খরচে চাহিদা মত চিকিৎসা নিতে পারতেন।