চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাস দমন ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের লক্ষ্যে বৃহৎ পরিসরে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে যৌথবাহিনী। গতকাল সোমবার ভোর সাড়ে ৫টা থেকে শুরু হওয়া এ অভিযানে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবিসহ প্রায় চার হাজার সদস্য অংশ নেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে অভিযান শুরু হয়। অভিযানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৪৮৭ জন, জেলা পুলিশের ১৪৬ জন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ৮০০ জন, আরআরএফ চট্টগ্রামের ৪০০ জন, ফেনী জেলা পুলিশের ১০০ জন, পার্বত্য জেলার ৩০০ জন, এপিবিএনের ৩৩০ জন, বিজিবির ১২২ জন এবং র্যাবের ৩৭১ জন সদস্যসহ মোট ৩ হাজার ১৮৩ জন অংশগ্রহণ করেন। পাশাপাশি সাতজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান তদারকি করেন।
অভিযান কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য তিনটি হেলিকপ্টার, ১৫টি সাঁজোয়া যান (এপিসি), তিনটি ডগ স্কোয়াড এবং ১২টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়। পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় একযোগে অবস্থান নিয়ে যৌথবাহিনীর সদস্যরা চিরুনি তল্লাশি চালান। সন্দেহভাজন আস্তানা, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি, পাহাড়ি পথ ও গোপন স্থাপনায় অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করা হয়।
অভিযানকালে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র (একটি পিস্তল ও একটি এলজি), চারটি কার্তুজ, ১১টি ককটেল, ১৭টি দেশীয় অস্ত্র, ১৯টি সিসি ক্যামেরা, দুটি ডিভিআর, একটি পাওয়ার বক্স এবং দুটি বাইনোকুলার উদ্ধার করা হয়। এসব সরঞ্জাম সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হতো বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যরা জঙ্গল সলিমপুরের বিভিন্ন প্রবেশমুখ দিয়ে একাধিক দলে বিভক্ত হয়ে অভিযান পরিচালনা করেন। একই সঙ্গে এলাকায় প্রবেশ ও বাহিরের পথে তল্লাশি চৌকি বসিয়ে কঠোর নজরদারি করা হয়।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত সুপার (গণমাধ্যম) মো. রাসেল জানান, অভিযান চলাকালে জঙ্গল সলিমপুরের বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালানো হয়। পাহাড়ি ও দুর্গম এ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের অবস্থান, অবৈধ অস্ত্র মজুদ এবং বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের আত্মগোপনের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযান শেষে বেলা ১১টার দিকে সলিমপুরের প্রবেশমুখে সাংবাদিকদের চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপরাধ) নাজমুল হাসান বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের আস্তানা উচ্ছেদ এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের উদ্দেশ্যে এ সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরও জানান, এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
অভিযান চলাকালে যৌথবাহিনী সলিমপুরের ভেতরে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়। ছিন্নমূল এলাকা অতিক্রম করে আলীনগরে প্রবেশের আগে রাস্তায় একটি ট্রাক দিয়ে ব্যারিকেড দেওয়া ছিল, যা সরিয়ে সামনে এগোয় বাহিনী। কিছু দূরে একটি কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়েছিল যাতে কেউ সেখানে যেতে না পারে। পরে কালভার্টের অংশ ইট-বালি দিয়ে ভরাট করে যৌথবাহিনীর গাড়ি আলীনগরে প্রবেশ করে। অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুরো এলাকা ঘিরে রেখে তল্লাশি কার্যক্রম চালানো হয়।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি (অতিরিক্ত আইজিপি) মো. আহসান হাবীব পলাশ জানান, দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় একটি চক্র সরকারি নিয়মকানুন উপেক্ষা করে অবৈধভাবে জমির কাগজ তৈরি, জমি দখল ও হস্তান্তরের কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। পরিস্থিতি এমন ছিল যে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও সেখানে প্রবেশ করতে ভয় পেতেন।
তিনি বলেন, এর আগে চারবার অভিযান চালানোর চেষ্টা করা হলেও সফল হওয়া যায়নি। এবার পঞ্চমবারের মতো সমন্বিত অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসী চক্রের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়েছে এবং এলাকায় রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
ডিআইজি জানান, অভিযানে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন ইউনিট থেকে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট না পাওয়ায় আটক ব্যক্তির সঠিক সংখ্যা পরে নিশ্চিত করা হবে। অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে এখনও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও বলেন, অভিযানের পর এলাকায় স্থায়ীভাবে দুটি ক্যাম্প স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশের একটি ক্যাম্প এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের একটি ক্যাম্প চালু থাকবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আবার মাথাচাড়া দিতে না পারে।
এদিকে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দীর্ঘদিনের প্রতিবন্ধকতা দূর হওয়ায় এখন সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, শহরের খুব কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও এতদিন এলাকা প্রশাসনের জন্য একটি বড় সমস্যা ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত অভিযানের ফলে সেই বাধা দূর হয়েছে এবং এখন থেকে সরকারের নেওয়া উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, গত ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে আসামি ধরতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। এ ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামি করা হয় মোহাম্মদ ইয়াসিনকে এবং প্রায় ২০০ জনকে আসামি করা হয়। ওই ঘটনার পরই এলাকায় বড় ধরনের সমন্বিত অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার পশ্চিমে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত জঙ্গল সলিমপুর এলাকা অবস্থিত। পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা এই খাসজমির বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।