চট্টগ্রাম জেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মৌসুমে আমন ধানের আবাদ, কর্তন ও উৎপাদনের চূড়ান্ত চিত্রে দেখা গেছে-বিভিন্ন প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও জেলায় মোট উৎপাদন সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। তবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কিছু কাঠামোগত ও প্রাকৃতিক বাধা স্পষ্টভাবে প্রভাব ফেলেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট আবাদকৃত জমি ১,৭৯,৮০৯ হেক্টর। মোট কর্তনকৃত জমি প্রায় সমপরিমাণ (১,৭৯,৮০৯ হেক্টর)। গড় ফলন (সামগ্রিক) প্রায় ২.৯৫ টন/হেক্টর। মোট উৎপাদন ৫,০০,৬২৫.৯৭ মেট্রিক টন। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, জেলায় আবাদকৃত প্রায় পুরো জমি থেকেই ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হয়েছে, যা একটি ইতিবাচক দিক। হাইব্রিড আমন আবাদ প্রায় ৬,৯৭৪ হেক্টর। গড় ফলন ৩.১০ টন/হেক্টর। মোট উৎপাদন ২৭,৯১৬ মেট্রিক টন। হাইব্রিড জাতের ধানে ফলন বেশি হলেও আবাদ তুলনামূলক কম। এর প্রধান কারণ উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ।

উফশী (উন্নত) আমন আবাদ প্রায় ১,৫০,২১৩ হেক্টর। গড় ফলন প্রায় ৩.০০ টন/হেক্টর (গড়)। মোট উৎপাদন প্রায় ৪,৬৫,৬৬০.৩ মেট্রিক টন।

এই শ্রেণির ধান জেলায় সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে এবং মোট উৎপাদনের বড় অংশই এসেছে এখান থেকে। কৃষকরা তুলনামূলক স্থিতিশীল ফলন পাওয়ায় এই জাতের প্রতি বেশি ঝুঁকেছেন। স্থানীয় জাতের আমন আবাদ তুলনামূলকভাবে কম বা বিচ্ছিন্ন। গড় ফলন ১.৬৩ টন/হেক্টর। মোট উৎপাদন ৩৭,০৪৯.৬৭ মেট্রিক টন। স্থানীয় জাতের ধান পরিবেশ সহনশীল হলেও ফলন কম হওয়ায় এর চাষ ধীরে ধীরে কমছে।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় উৎপাদনের তারতম্য লক্ষ্য করা গেছে-মিরসরাই ও সীতাকু- তুলনামূলক বেশি আবাদ ও উৎপাদন হয়েছে। ফটিকছড়ি ও রাউজান মধ্যম পর্যায়ের ফলন হয়। বোয়ালখালী, কর্ণফুলী ও আনোয়ারা কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার প্রভাব রয়েছে। সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া অঞ্চলে ভালো ফলনের সম্ভাবনা থাকলেও আবাদ কমেছে।সন্দ্বীপ নতুন চরাঞ্চলে আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে।

উপজেলা ভেদে মাটি, পানি, আবহাওয়া ও অবকাঠামোগত অবস্থার কারণে ফলনে ভিন্নতা দেখা গেছে। প্রতিবেদনে একাধিক কাঠামোগত ও প্রাকৃতিক কারণ উল্লেখ করা হয়েছে- অর্থনৈতিক কারণে ধানের তুলনায় সবজি ও অন্যান্য ফসলের বাজারমূল্য বেশি হওয়ায় কৃষকরা ফসল পরিবর্তন করেছেন। ধানের ন্যায্যমূল্য সব এলাকায় নিশ্চিত না হওয়া এবং প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত কারণে। অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা, বিশেষ করে পাহাড়ি পাদদেশে। জোয়ারের সময় লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ। কিছু এলাকায় খাল-নদী ভরাট ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতা।

নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে চাষযোগ্য জমি হ্রাস হচ্ছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে (যেমন ওয়াসা) জমি অধিগ্রহণ। নতুন বসতি ও অবকাঠামো নির্মাণ। কৃষি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত কারণ। আগাম শীতকালীন সবজি চাষ বৃদ্ধি। পর্যাপ্ত প্রণোদনা ও প্রযুক্তি সহায়তার ঘাটতি কিছু এলাকায়। সব বাধা সত্ত্বেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক উৎপাদন ধরে রাখতে সহায়তা করেছে। এরমধ্যে কৃষি বিভাগের প্রণোদনা ও সহায়তা কার্যক্রম নতুন চরাঞ্চলে আবাদ সম্প্রসারণ। কিছু এলাকায় ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হওয়া। উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার বৃদ্ধি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিগত সহায়তা থাকলে চট্টগ্রামে আমন উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। এজন্য কৃষকদের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা। লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে উপযুক্ত ব্যবস্থা চাষযোগ্য জমি সংরক্ষণে কঠোর নীতি। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও প্রণোদনা বাড়ানো।

সার্বিকভাবে, ২০২৫–২৬ মৌসুমে চট্টগ্রাম জেলায় আমন ধানের উৎপাদন একটি স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। তবে উৎপাদন আরও বাড়াতে হলে অর্থনৈতিক প্রণোদনা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত কৃষিনীতি বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে আমন ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল।