প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মেরামত ও সংস্কার খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যবহারে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সংস্কার ও মেরামতের জন্য এ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে বাস্তবে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে নামমাত্র কাজ হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে কোনো কাজই করা হয়নি বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরসূত্রে জানা যায়, প্রথম ধাপে সারাদেশের ১২ হাজার ৫৩১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ৪১ কোটি ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ধাপে একই বিদ্যালয়গুলোর জন্য আরও ৮২ কোটি ২৩ লাখ ৫২ হাজার ৬৪২ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে লক্ষ্মীপুর জেলার ৩১১টি বিদ্যালয়ের জন্য সংস্কার কাজের অর্থ বরাদ্দ করা হয়। গড়ে প্রতিটি বিদ্যালয় ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত পেয়েছে।
বরাদ্দের শর্ত অনুযায়ী বিদ্যালয় ভবনের ক্ষতিগ্রস্ত কক্ষ, দরজা-জানালা, বেঞ্চ-ডেস্ক, স্যানিটেশন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও পানির লাইনের জরুরি সংস্কার করার কথা ছিল। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক বিদ্যালয়ে এসব কাজ না করেই নতুন মালামাল কেনার নামে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষা কর্মকর্তাদের অনুমোদন পাওয়ার জন্য এসব বিল প্রস্তুত করা হচ্ছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, ভাগাভাগির ভিত্তিতে বিল অনুমোদনের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, বেশিরভাগ বিদ্যালয়ের কেনাকাটার তালিকায় এলইডি বাল্ব, সিটকিনি, হ্যাজবোল্ট, হারপিক, বালতি, ইলেকট্রিক ফিটিংস, বৈদ্যুতিক তার, ইট, বালু, সিমেন্ট ও মাটিসহ বিভিন্ন সামগ্রী ক্রয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এসব জিনিস আগেই স্লিপ ফান্ড থেকে কেনা হয়েছিল।
এছাড়া ২৫০ টাকার একটি এনার্জি বাল্বের দাম হাজার টাকা দেখিয়ে ৫ থেকে ১০টি বাল্ব কেনার বিল করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। টিউবওয়েল মেরামতের জন্য ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা, বৈদ্যুতিক মোটর মেরামতের জন্য একই পরিমাণ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। কয়েকটি বিদ্যালয়ে অর্ধশত জানালা মেরামতের কথা বলা হলেও সরেজমিনে গিয়ে তার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে দেখানো মালামালও বিদ্যালয়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
রায়পুর উপজেলার সাতটি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্বাচন উপলক্ষে এক থেকে দেড় লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। ওই অর্থ দিয়ে টয়লেট পরিষ্কার, ইলেকট্রিক মোটর মেরামত, আলমারির লক, সিটকিনি, হ্যাজবোল্ট ও তালা বসানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে টয়লেট পরিষ্কারের কিছু কাজ ছাড়া অন্য কোনো সামগ্রীর অস্তিত্ব দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানগুলো।
রায়পুরের কাজিরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “দেড় লাখ টাকা দিয়ে টয়লেট পরিষ্কার ও রং করা হয়েছে। সিটকিনি, হ্যাজবোল্টসহ কিছু জিনিস কেনা হয়েছে।”
কেরোয়া রোকেয়া মেমোরিয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জোবেদা নাহার বলেন, “বরাদ্দকৃত অর্থ দিয়ে শুধু টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে।”
গাইয়ারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনোজ কুমার বলেন, “ভোটকেন্দ্রে চারটি বুথ করা হয়েছিল। এক লাখ টাকার মধ্যে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।”
স্থানীয় শিক্ষক ও কর্মচারীরা জানান, অনেক ক্ষেত্রে কোনো কাজই করা হয়নি।
একাধিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সংস্কারের নামে যেসব মালামাল কেনা দেখানো হয়েছে তার বেশিরভাগই কাগজে-কলমে। কোন দোকান বা সরবরাহকারীর নামে বিল দেখানো হয়েছে, সে সম্পর্কেও তারা নির্দিষ্ট তথ্য দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তার যোগসাজশে ভুয়া বিল তৈরি করে সিংহভাগ অর্থ আত্মসাৎ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই অনুসন্ধানে নিজেকে শিক্ষক পরিচয় দিয়ে একাধিক সহকারী শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসব শিক্ষক স্বীকার করেছেন, কাগজে-কলমে দেখানো অধিকাংশ কাজ বাস্তবে হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাদের অভিযোগ, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বরাদ্দকৃত অর্থের অর্ধেক টাকা নিজের জন্য রাখতে বলেছেন।
কয়েকজন শিক্ষক আরও অভিযোগ করেন, অর্ধেক টাকা না দিলে বিল অনুমোদন আটকে দেওয়ার হুমকি দিয়ে বারবার মুঠোফোনে ফোন করা হয়েছে। এতে অনেক শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এ বিষয়ে রায়পুর, রামগঞ্জ ও সদর উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তারা বলেন, সংসদ নির্বাচনের আগে স্কুল সংস্কারের কাজ করা হয়েছে। তবে কী কী কাজ হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য তারা দিতে পারেননি। কমলনগর ও রামগতির উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারাও একই ধরনের বক্তব্য দেন।
লক্ষ্মীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাজ্জাদ বলেন, “এই বরাদ্দগুলো উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন খাতে দেওয়া হয়েছে। খাত অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো এ অর্থ ব্যয় করবে। ভোটকেন্দ্র মেরামতের বরাদ্দ নির্বাচনের আগেই ব্যয় করার কথা ছিল। এছাড়া কেন্দ্রগুলোতে সিসি ক্যামেরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা স্থাপন করেছেন। অনিয়মের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।