হাসিনা সরকার আমাগো প্লেটের ভাত কাইড়া নিছে। ২০২০ সালে হঠাৎ কইরা পাটকল বন্ধ কইরা দিছে। তহন ১৫ বছর চাকরি কইরা বেকার হয়ে গেছি। দুই সন্তান স্ত্রী নিয়া কি করমু কোথায় যামু। পাটকল বন্ধ ওয়াই (হওয়ায়) সব ওলট-পালট হইয়া গেছে। অভাব-অনটনে পইরা যাই। গ্রামের বাড়ি বরিশালে না যাইয়া এই শহরেই থাইক্কা গেছি। ইজিবাইক চালাইয়া সংসার চালাচ্ছি। ক্রিসেন্ট জুটমিলের মায়া ছাড়তে না পেরে মিলের সামনেই বাসাভাড়া নিয়ে থাহি। ক্রিসেন্ট জুটমিলের সামনের সড়কে ইজিবাইক নিয়ে যাত্রীর অপেক্ষায় থাকা বন্ধ ক্রিসেন্ট জুটমিলের তাঁতি জাকির খানের সাথে কথা হলে গণমাধ্যমকর্মীদের এক নাগাড়ে এ কথাগুলো বলেন।

তিনি অনেকটা ফুরফুরে মেজাজে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কইছেন, দেশে বন্ধ থাকা সব কারখানা চালু করা হবে। আল্লাহ চাইলে আমাগো আবারও সুদিন আইতে পারে। যাত্রী মিলছে না বলে তিনি খোশগল্পে মেতে ছিলেন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটি ইজিবাইক চালকের সাথে। আলোচনার প্রসঙ্গ আবারও বন্ধ পাটকলগুলো খুলবে। তখন কর্মে ফিরবে বন্ধ ক্রিসেন্ট জুটমিলের তাঁতি জাকির। তিনি জানান, পাটকল যখন বন্ধ হয় তখনই এই মিলে স্থায়ী প্রায় ৪ হাজার শ্রমিক ছিল আর অস্থায়ী ছিল প্রায় ১০ হাজার। বর্তমানে এসব বেকার শ্রমিকরা অনেক কষ্টে আছে। অনেকে রোগে শোকে মারাও গেছেন।

চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ নিয়ে একাধিক শ্রমিক বলেন, বন্ধ কলকারখানা চালু করবেন প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণায় চোখে আশার আলো দেখছি। তারা চান, সরকার দ্রুত এবং ইজারার মাধ্যমে না দিয়ে রাষ্ট্রীয় মিলগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে আবার চালু করার, যাতে পুনরায় কর্মমুখর হয়ে ওঠে এই জনপদ।

২০২০ সালের ১ জুলাই খুলনা-যশোর অঞ্চলের নয়টিসহ দেশের ২৫টি পাটকলের উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাটকলগুলো, খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত আলিম জুটমিল, ক্রিসেন্ট, ইস্টার্ন, প্লাটিনাম, স্টার, দৌলতপুর ও খালিশপুর জুট মিল, যশোরের কার্পেটিং ও যশোর জুট ইন্ডাস্ট্রিজ (জেজেআই) জুটমিল। খুলনার নয়টি পাটকলের জমির পরিমাণ ৫১৬ একর।

জানা গেছে, শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা আবার চালুর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুক্রবার (১ মে) বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

৪ মে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বন্ধ কল-কারখানার বিষয়ে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এমন উদ্যোগে স্বপ্নে বিভোর হয়ে নড়ে চড়ে বসছেন খুলনাঞ্চলের বন্ধ পাটকলের শ্রমিকরা। সাইরেনের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।

খুলনার শিল্পাঞ্চল খ্যাত খালিশপুর দৌলতপুর ঘুরে দেখা গেছে, খুলনার পাটকলগুলোতে এক সময় শ্রমিকদের আনাগোনায় ব্যস্ত আর কোলাহলে পূর্ণ থাকা জুটমিলে সুনসান নীরবতা। শ্রমিক কলোনীগুলোতে হতাশায় ভরা। পলেস্তারা খসে পড়ছে। ধুলার পুরু আস্তরণ জানান দিচ্ছে, কতকাল কোনো পদচিহ্ন পড়েনি, বসেনি কোনো ক্লান্ত শ্রমিক। একসময়ের কর্মচাঞ্চল্যমুখর আঙিনা এখন খাঁ খাঁ করছে। পাটকলের যন্ত্রপাতি-মেশিনগুলোতে মরিচা ধরে যাচ্ছে। শ্রমিকরা এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ায় অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন।

পাট শ্রমিকদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল রক্ষায় খুলনা-যশোর আঞ্চলিক কমিটির আহ্বায়ক মো. সমশের আলম বলেন, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ করে দিয়ে প্রায় ৭০ হাজার স্থায়ী শ্রমিককে স্বেচ্ছা অবসরে (গোল্ডেন হ্যান্ডশেক) পাঠায়। যাদের মধ্যে অনেকেই টাকা পয়সা পায়নি। আমরা তখন তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলি। রাজপথে থালা-বাসন হাতে ভুখা মিছিল কর্মসূচিও করেছি।

পাটকলগুলোতে কেন লোকসান হয় এমন প্রশ্নের জবাবে শমসের বলেন, পটকলগুলোতে লোকসানের বড় কারণ বিজিএমসির কর্মকর্তাদের দুর্নীতি। কাঁচা পাট কেনায় অব্যবস্থাপনা। তারা পাট কেনে দেরিতে ও বেশি দামে। এ কারণে প্রধানত লোকসান হয়। পাটকাল চালুর উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও তিনি আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো লিজের মাধ্যমে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া থেকে সরকারকে সরে আসার দাবি জানান এই শ্রমিক নেতা।

আর্থিক ক্ষতির কারণ দেখিয়ে ২০২০ সালের ২ জুলাই খুলনা অঞ্চলের নয়টিসহ দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫ জুটমিল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে চাকরি হারান খুলনা অঞ্চলের পাটকলগুলোর স্থায়ী-অস্থায়ী প্রায় ৩৪ হাজার শ্রমিক। ২০২১ সালের এপ্রিলে সরকার এ ২৫টি পাটকলের মধ্যে ১৭টিকে বেসরকারি খাতে পাঁচ থেকে ২০ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ইজারা নিয়ে ২০২৩ সালের ৩ ডিসেম্বর দৌলতপুর জুট মিল দায়সারাভাবে চালু করেছে ফরচুন গ্রুপ।

বিজেএমসি সূত্রে জানা গেছে, খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত নয়টি পাটকলের পাঁচটি ইজারা সম্পন্ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের ডিজিএম ড. জুলফিকার বলেন, খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর মধ্যে কার্পেটিং, জেজেআই, ইস্টার্ণ, দৌলতপুর ও খালিশপুর জুটমিল ইজারা দেওয়া আছে। ক্রিসেন্ট জুটমিল ইজারা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে হস্তান্তর করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এ ছাড়া প্লাটিনাম, আলিম ও স্টার ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়াধীন।

বন্ধ পাটকল চালু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে দেখেছি বন্ধ কলকারখানা আবারও চালু হবে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে আমরা কোনো চিঠি পায়নি।