চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদ এলাকায় প্রকাশ্যে গুলী করে হত্যা করা হয়েছে রাউজান উপজেলার এক যুবককে। নিহত যুবকের নাম হাসান রাজু (৩২)। তিনি রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ শমসেরপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং আবুল কালামের ছেলে। একই ঘটনায় পথচারী মোছাম্মৎ রেশমি আক্তার (১১) নামে এক মেয়ে শিশু চোখে গুলীবিদ্ধ হয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টা থেকে ১০টার মধ্যে বায়োজিদ থানার রৌফাবাদের শহীদ মিনার সংলগ্ন বাঁশবাড়িয়া বিহারি কলোনি এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল পরিকল্পিত ও প্রকাশ্য ব্রাশফায়ার-যেখানে মুখে মাস্ক পরা পাঁচ থেকে ছয়জন অস্ত্রধারী যুবক হাসান রাজুকে ধাওয়া করে মাথায় গুলী করে নিশ্চিতভাবে হত্যা করে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, হাসান রাজু কয়েকদিন আগে বোনের বাসায় বেড়াতে রৌফাবাদে আসেন। ঘটনার রাতে তিনি বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় আসতেই একদল অস্ত্রধারী তাকে লক্ষ্য করে ‘ধর, ধর’ বলে ধাওয়া শুরু করে। সরু গলির ভেতর দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলেও হামলাকারীরা মুহুর্মুহু গুলী ছুড়তে থাকে। একপর্যায়ে রাজু মাটিতে লুটিয়ে পড়লে দুর্বৃত্তরা তাকে পা দিয়ে চেপে ধরে মাথায় একের পর এক গুলী করে মৃত্যু নিশ্চিত করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

প্রত্যক্ষদর্শী ফরিদা আক্তার বলেন, ধর, ধর-চিৎকার শুনে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে দেখি পাঁচ-ছয়জন মাস্ক পরা অস্ত্রধারী রাজুকে তাড়া করছে। কিছুক্ষণ পর টুসটাস শব্দ শুনি। হঠাৎ রাজু মাটিতে পড়ে যায়। এরপর তাকে পা দিয়ে চেপে ধরে একের পর এক গুলী করা হয়।

তিনি আরও বলেন, “গুলীর শব্দে আশপাশের সব বাসা থেকে লোকজন বের হয়। কিন্তু সন্ত্রাসীদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র থাকায় কেউ এগিয়ে যেতে সাহস করেনি।”

এ সময় বাসা থেকে দোকানে যাওয়ার পথে গুলীবিদ্ধ হয় রেশমি আক্তার নামে এক শিশু। সে বায়েজিদ রৌফাবাদ কলোনির শহীদ মিনার গলির রিয়াজ আহমেদের মেয়ে। শিশুটির বড় ভাই আহমেদ জানান, কিছু সন্ত্রাসী হঠাৎ গোলাগুলী শুরু করলে একটি গুলী তার বোনের চোখে লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত চমেক হাসপাতালে নেওয়া হয়।

চমেক পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই নুরুল আলম আশেক জানান, আহত রেশমিকে প্রথমে ২ নম্বর ওয়ার্ডে নেওয়া হয়। পরে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার অবস্থা আশঙ্কাজনক।

ঘটনার খবর পেয়ে বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে হাসান রাজুর লাশ উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) মোহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ।

বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল করিম বলেন, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পূর্ববিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ঘটনাটি পরিকল্পিত। কারা জড়িত এবং কী কারণে হত্যা করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ এপ্রিল রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ শমসেরপাড়া এলাকায় নাছির উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে গুলী করে হত্যা করা হয়। তিনি প্রবাসফেরত এবং স্থানীয়ভাবে যুবদলের কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ওই ঘটনায় নিহত নাছিরের পরিবার হাসান রাজুর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে। পুলিশ ধারণা করছে, নাছির হত্যার প্রতিশোধ হিসেবেই রাজুকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

স্থানীয়দের দাবি, নিহত রাজু আলোচিত নাছির হত্যা মামলার অন্যতম আসামী ছিলেন। যদিও নিহতের পরিবার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। রাজুর বোন রুমা আক্তার বলেন, “আমার ভাই পেশায় দিনমজুর। তার সঙ্গে কারও কোনো বিরোধ ছিল না।”

নিহতের মা সখিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “গত মাসের ১৪ তারিখ আমার ছেলে একটি কন্যাসন্তানের বাবা হয়েছে। মেয়ের মুখে বাবা ডাক সে আর শুনতে পারল না। আমার ছেলে কোনো হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল না। যারা আমার ছেলেকে মেরেছে, আমি তাদের শাস্তি চাই।”

পুলিশ আরও জানিয়েছে, এ ঘটনায় পলাতক সন্ত্রাসী মোহাম্মদ রায়হানের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। নিহত নাছির রায়হানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নগর ও রাউজানে অন্তত ১৪টি হত্যাকাণ্ডে রায়হানের নাম উঠে এসেছে। তিনি বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারী বলেও জানা গেছে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে রাউজানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত দেড় বছরে সেখানে অন্তত ২৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১৬টি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সর্বশেষ হাসান রাজু হত্যাকাণ্ডও সেই সহিংস ধারাবাহিকতারই অংশ।