মোহাম্মাদ মনিরুজ্জামান, মোংলা সংবাদদাতা
পদ্মা সেতু ও রেল যোগাযোগ চালু হওয়ার পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলার সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। অবকাঠামোগত উন্নয়ন সত্ত্বেও পশুর নদী এবং আন্তর্জাতিক নৌপথ মোংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলের নাব্যতা সংকটের পাশাপাশি কাস্টমস-সংক্রান্ত জটিলতা বন্দরের কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে জাহাজ চলাচল, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম এবং সরকারি রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত গতি আসছে না।
ব্যবসায়ীরা জানান, পশুর নদী ও ঘষিয়াখালী চ্যানেলে নিয়মিত পলি জমে গভীরতা কমে যাওয়ায় অধিক ড্রাফটের বাণিজ্যিক জাহাজ সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারছে না। এ কারণে অনেক জাহাজকে বহির্নোঙরে অবস্থান করে পণ্য খালাস করতে হচ্ছে। এতে সময় ও ব্যয় দুই-ই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
চ্যানেলের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে এরই মধ্যে ড্রেজিংয়ের দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে আরও একটি বৃহৎ ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রকল্পের বাস্তব সুফল পেতে এখনও কিছুটা সময় প্রয়োজন হবে।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, কাস্টমসের বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা এবং পণ্য খালাস প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে বন্দরের প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে। শুল্কায়ন ও ছাড়পত্রের নানা ধাপ ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে ধীর করে দিচ্ছে, যার প্রভাব বন্দরের সামগ্রিক রাজস্ব আদায়েও পড়ছে। দ্রুত এসব সমস্যা সমাধান করা না গেলে বন্দরের উন্নয়নে নেওয়া বড় বিনিয়োগের প্রত্যাশিত ফল অর্জন কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে অনেক আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী বিকল্প বন্দরের দিকেও ঝুঁকছেন।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পশুর নদী ও মোংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলের নাব্যতা উন্নয়নে ড্রেজিং কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বড় ড্রাফটের জাহাজ সরাসরি জেটিতে ভেড়ানোর লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মাধ্যমে দ্রুতগতিতে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া কাস্টমসের প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে শুল্কায়ন প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্দর ব্যবহারকারীদের সুবিধা বাড়াতে ২৪ ঘণ্টা পণ্য খালাসের সুবিধাসহ বিভিন্ন আধুনিক সেবা চালুর প্রস্তুতিও চলছে। একই সঙ্গে পদ্মা সেতু ও রেল সংযোগের পূর্ণ সুফল নিশ্চিত করতে জেটি ও টার্মিনালের আধুনিকায়ন এবং বন্দর ব্যবহারের ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বন্দরের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে বিভিন্ন উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। নিয়মিত ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি পশুর চ্যানেলের ইনার বারে সংরক্ষণমূলক ড্রেজিং পরিচালিত হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে জোয়ারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ সরাসরি জেটিতে নোঙর করতে পারে।
এদিকে কাস্টমস ও শুল্কায়ন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে ডিজিটাল ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) চালুর প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এটি চালু হলে ব্যবসায়ীদের পণ্য ছাড়ের সময় কমবে এবং প্রশাসনিক ভোগান্তিও হ্রাস পাবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
বর্তমান জটিলতাগুলোর সমাধানে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে একটি ত্রিপক্ষীয় সমন্বয় সভা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রেলপথে কনটেইনার পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমাতে বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে বিশেষ ট্যারিফ বা ভাড়া ছাড়ের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, সরকারের চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বন্দরটি ধীরে ধীরে একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের সমুদ্রবন্দরে পরিণত হবে এবং দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।