মোঃ রফিকুল ইসলাম (কালিগঞ্জ) সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার তালের রসের গুড় ও পাটালি একটি ঐতিহ্যবাহী ও বাণিজ্যিক কৃষিপণ্য। প্রতি বছর গ্রীষ্মকালে (চৈত্র-বৈশাখ মাসে) উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এই সুস্বাদু পাটালি তৈরি হয় যা স্থানীয় ও জাতীয় চাহিদা পূরণ করে। তাল গাছ থেকে সংগৃহীত রস জ্বাল দিয়ে ঘন করা হয় এবং নির্দিষ্ট ছাঁচে ঢেলে শক্ত করে ‘পাটালি’ প্রস্তুত করা হয়। এটি একটি অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য কাজ, যেখানে একজন গাছিকে দিনে অন্তত তিনবার গাছে উঠতে হয়। সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার এই পণ্যটি এখন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম যেমন Dara এবং বিভিন্ন ফেসবুক পেজের মাধ্যমে দেশব্যাপী বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হচ্ছে।

কালিগঞ্জ উপজেলার ২৭৭টি গ্রাম-গঞ্জে উচু জমি, নিচু জমির আইলে ও ধারে চাষিরা তাল গাছ রোপণ করেছে। এ ছাড়া প্রাকৃতিকভাবে তাল জন্মায়। তালের পাকা আটি রোপণ করে চাষিরা। তা থেকে ২০-২৫ দিন পর চারা বের হয়। তাল গাছ দুই শ্রেণীর হয় পুরুষ স্ত্রী তাল গাছ। গ্রাম্য ভাষায় পুরুষ তাল গাছকে জোটা তাল গাছ বলে আর স্ত্রী তাল গাছকে তেলো তাল গাছ বলে। উভয় তাল গাছে রস হয়। কিন্তু তাল গাছে তাল হয়। বর্তমানে কালিগঞ্জ উপজেলার হাট-বাজার গুলোতে এক কেজি পাটালির দাম ৩০০-৪০০ টাকা আর এক কেজি গুড় বিক্রি হচ্ছে ২০০-৩০০ টাকা দরে।

গ্রীষ্মের অন্যতম জনপ্রিয় খাবার তালের পাটালি। কালিগঞ্জ উপজেলার গ্রাম এলাকায় চৈত্র মাসের শেষে এবং বৈশাখের শুরুতে গাছীরা তাল গাছের রস দিয়ে বিভিন্ন পদ্ধতিতে তালের গুড় তৈরি করে যা খুব প্রসিদ্ধ এবং খেতে অত্যন্ত সুস্বাদু। তবে এটি তৈরি করা প্রচন্ড সময় সাপেক্ষ এবং প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। সারাদিনে একটি তালগাছে তিন বার গাছে উঠতে হয় তারপর সেই গাছ ভাল করে পরিষ্কার করে তাল গাছের ডগা কেটে সেই গাছে হাড়ি ঝুলিয়ে তালের রস সংগ্রহ করতে হয়।

তারপর সেই রস গাছ থেকে নামিয়ে চুলায় আগুনে দিয়ে জ্বাল দিয়ে যখন গুড় দানা হয়ে আসবে তারপর তালের একটি ডগা দিয়ে সেটাকে হাতের সাহায্যে ভাল করে নাড়তে হবে যাতে গুড় বসে না যায়।

তারপর ওই রস জালিয়ে ঘন হয়ে গেলে যে কোনো কাপড় বা পাত্রে ঢেলে দিতে হবে যেন আপনি যে কোনো ডিজাইন করতে পারেন। তার পর একটু ঠান্ডা হলে ছুরি বা অন্য কোনো ধারালো কিছু দিয়ে বিভিন্ন আকৃতিতে কেটে নিতে হবে। আর এই তালের গুড় দিয়ে প্রয়োজনীয় অনেক খাবারের মেনু তৈরি করতে পারেন। মূলত এ দিয়ে যে কোনো ধরনের পিঠে পায়েশ, সেমাই রান্না করা যায়।

এ ছাড়া এই গরমে তালের গুড় দিয়ে শরবত বানিয়ে খেয়ে থাকেন অনেকেই। সাদা ধবধবে নিটোল চেহারা। গায়ে গুড়োঁ চিনির মতো গুড়ের গুঁড়ো লেগে থাকে। বৈশাখী গরম চড়তে শুরু করলে বাজারে দেখা মেলে তাল পাটালির। শীতের খেজুর গুড়ের পাটালির মতো এগুলো বেশি পরিমাণ মেলে না যদিও। তবু অনেকের কাছে গরম কাল অপেক্ষার শুধু তাল পাটালির জন্যই। বলা হয় তাল পাটালি যত সাদা আর নরম হবে তত তার স্বাদ। পাটালি সাদা করার জন্য গাছিরা অনেক সময় ফিটকিরি মিশিয়ে দেন।

তাতে গুড় কড়ার গায়ে ঘষতে হয় কম ও পরিশ্রম কম হয়। কিন্তু ফটকিরি দিলে গুড় শক্ত হয়ে যায়। গরমে শরীর ঠান্ডা করার জন্য অনেকেই পানিতে মুড়ি ভিজিয়ে তার সঙ্গে তাল পাটালি দিয়ে খেয়ে থাকেন। তাল পাটালি তৈরি পরিশ্রম করছেন গুড় ও পাটালি ব্যবসায়িরা। বিক্রেতারা বলছেন রাতের বেলা তালের যে রস পাওয়া যায় তা দিয়ে ভোরে গুড বানানো যায় না। বিকালের রসে ভাল পাটালি হয়।

তাল গাছি দিপাংকর টেউর দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, তিনি কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা বাজারসহ উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রায় প্রতিদিন ১৫-২০ কেজি পাটালি বিক্রয় করে। বাজারে চাহিদা আছে প্রচুর। তিনি আরো বলেন, গত বছর তালের গুড়-পাটালি বিক্রি করেছি প্রায় দুই লক্ষ টাকা। খরচ বাদে লাভ হয়েছিল এক লাখেরও বেশি। আমার মতো এলাকায় আরো অনেক তাল গাছি আছে তারাও তালের পাটালি গুড় বিক্রি করে লাভবান হয়েছে।

কালিগঞ্জ উপজেলার গুড়ের হাটে তালের পাটালি কিনতে আসা কয়েক জন ক্রেতা বলেন, পাটালি দিয়ে পরোটা আর গরম রুটি খেতে মজায় আলাদা। কিন্তু এছাড়া একসময় পুরোনো মামার বাড়িতে বাক্স বাক্স মোয়া, নারিকেল নাড়ু-,তালের পাটালিসহ অনেক কিছু সামনে হাজির হতো। অনেকেই বলতো কই গো, কোথায় গেলে বুড়ো গিন্নি দেখ নতুন তালের পাটালি কিনে এনেছি।

তাল পাটালির সেন্ট অন্য রকম ঘরে, রাখলে ব্যাপকভাবে ঘ্রান বের হয়। আর এ ঘ্রানেই মানুষের মনে হয়, না খেলে নাকি সাধ মেটে না। এখন তাল পাটালির সময়।

কালিগঞ্জে হাট- বাজারে আবার মাঝে মাঝে তালের রস বিক্রি হয় এক গ্লাস রসের দাম ২০-২৫ টাকা। রাতের বেলা যে রস হয়, তা ভোরে গুড় করা যায় না। দুপুর, বিকেলের রসে ভালো পাটালি হয়, আবার ভালো গুড়ও তৈরি হয়।