নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম আরও সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের লক্ষ্যে ‘রিপ্রেজেন্টেশন অব দি পিপল (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল-২০২৬’, সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ বিল, ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন কর্মকর্তা সংশোধন বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।
গতকাল সোমবার ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনে বিলগুলো পাসের জন্য উত্থাপন করেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান আরপিওর ২৭, ৩৭, ৩৯, ৮৯ ও ৯১ অনুচ্ছেদ সংশোধনের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা অধ্যাদেশটি আইন আকারে পাস করার লক্ষ্যে সংসদে উত্থাপন করেন। এছাড়া আরপিও-তে পোস্টাল ব্যালট পেপারের বিষয়টি স্পষ্টকরণ, নিরাপত্তা জোরদারকরণে প্রয়োজনীয় সংশোধন করার জন্য বিগত সরকার এই অধ্যাদেশটি জারি করেছিল। যা আজ আইনে পরিণত হলো।
এর আগে, বিলের ওপর বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমানের উত্থাপিত একটি শব্দের অস্পষ্টতা নিয়ে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল ও আইনমন্ত্রীর মধ্যে সংক্ষিপ্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, নির্বাচন সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে ‘রিপ্রেজেন্টেশন অব দি পিপল অর্ডার ১৯৭২’ সংশোধন করে এর আগে ২০২৫ সালে দুটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী, গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে অধ্যাদেশ দুটি উপস্থাপন করা হয়।
মন্ত্রী আরও জানান, সংবিধান অনুযায়ী প্রথম বৈঠকের ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশ দুটি বিল আকারে সংসদে পাস করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই ধারাবাহিকতা রক্ষার্থেই বিলটি পাসের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি আইনে পরিণত হওয়ার ফলে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম আরও সুচারুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
বিলের আলোচনার শুরুতে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বিলের ৪৯ নম্বর পৃষ্ঠার ৮(বি) উপধারার একটি শব্দের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, এখানে শেষ শব্দটি কি ‘সিট’ হবে নাকি ‘কনস্টিটিউেন্সি’ হবে? জবাবে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল ও আইনমন্ত্রী বিষয়টি পর্যালোচনার আশ্বাস দেন।
পরে স্পিকারের অনুমতি নিয়ে আইনমন্ত্রী বিলটি পাসের প্রস্তাব করলে কণ্ঠভোটে তা সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। বিলটি পাসের সময় ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে বলে ঘোষণা করেন স্পিকার।
সীমানা নির্ধারণ আইনে সংশোধন : ‘জাতীয় সংসদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান উত্থাপন করলে কণ্ঠভোটে সেগুলো পাস হয়।
নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) সংশোধন বিল : অধিবেশনের শুরুতেই আইনমন্ত্রী ১৯৯১ সালের ‘নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন’ অধিকতর সংশোধনকল্পে বিলটি উত্থাপনের অনুমতি প্রার্থনা করেন। স্পিকারের অনুমতিক্রমে বিলটি উত্থাপিত হওয়ার পর মন্ত্রী এটি অবিলম্বে বিবেচনার প্রস্তাব দেন।
বিলের ওপর কোনো সংশোধনী প্রস্তাব না থাকায় দফাভিত্তিক আলোচনার পর এটি কণ্ঠভোটে দেওয়া হয়। মন্ত্রী বিলটি পাসের প্রস্তাব দিলে স্পিকার বলেন, আমার মনে হয় শুধু হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে তা নয়, সর্বসম্মতিক্রমে হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে। ফলে বিলটি নির্দিষ্ট আকারে পাস হয়। এই বিলের মাধ্যমে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন ও বিশেষ বিধান সংক্রান্ত প্রক্রিয়া আরও আধুনিকায়ন করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এরপর আইনমন্ত্রী ২০২১ সালের ‘জাতীয় সংসদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ আইন’ সংশোধনের জন্য নতুন একটি বিল উত্থাপন করেন। বিলটি উত্থাপনের পর মন্ত্রী বলেন, সময়ের প্রয়োজনে এবং নির্বাচনী এলাকাগুলোর সীমানা পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়াকে আরও সুসংহত করতে এই সংশোধন আনা হয়েছে।
এই বিলটির ওপরও কোনো সদস্যের সংশোধনী প্রস্তাব ছিল না। দফা ২ ও ৩ সহ বিলের শিরোনাম ও প্রবর্তন সংক্রান্ত অংশগুলো সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। পরবর্তীতে কণ্ঠভোটে ‘জাতীয় সংসদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ চূড়ান্তভাবে পাস হয়।
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বিলগুলো পাসের সময় এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সংক্ষেপে তুলে ধরেন। কোনো বিরোধিতা না থাকায় বিল দুটি পাসের প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত সম্পন্ন হয়।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের এই সংসদ অধিবেশনে নির্বাচনী সংস্কারের অংশ হিসেবে এই আইনগুলো সংশোধন করা হলো।
সংসদে ‘ভোটার তালিকা সংশোধন বিল ২০২৬’ পাস : ভোটাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘ভোটার তালিকা (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।
গতকাল সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
সংসদীয় কার্যক্রমের শুরুতেই স্পিকার বিলটির ওপর দফাওয়ারি সংশোধনীগুলো হাউসে উত্থাপন করেন। এ সময় কোনো সংশোধনী না থাকায় বিলের ধারা ২, ৩ ও ৪ এবং শিরোনাম ও প্রস্তাবনাগুলো কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়।
বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, সার্বজনীন ভোটাধিকার নীতি বাস্তবায়নের স্বার্থে জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ অন্যান্য নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার যৌক্তিক সময় পূর্ব পর্যন্ত যাদের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয়, তাদেরকেও ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ প্রদানের নিমিত্তে এই সংশোধনী আনা হয়েছে।
আইনমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী পূর্ববর্তী অধ্যাদেশটিকে আইনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সংসদের প্রথম বৈঠকের ৩০ দিনের মধ্যে বিল আকারে পাস করার বাধ্যবাধকতা ছিল। প্রস্তাবিত বিলটি আইনে পরিণত করা হলে সার্বজনীন ভোটাধিকার নীতি বাস্তবায়ন আরও সহজতর হবে।
মন্ত্রী বিলটি পাসের জন্য প্রস্তাব করলে স্পিকার তা ভোটে দেন। ডেপুটি স্পিকারের সঞ্চালনায় সংসদ সদস্যদের ‘হ্যাঁ’ ভোটে সর্বসম্মতিক্রমে বিলটি পাস হয়।
উল্লেখ্য, ‘ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯’ সংশোধনের লক্ষ্যে গত বছর ‘ভোটার তালিকা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়েছিল, যা আজ পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপান্তরিত হলো।