খুলনা ব্যুরো

সুন্দরবনের বুক চিরে বয়ে চলা নদনদী আর উপকূলীয় অঞ্চলের খাঁচায় খাঁচায় এখন প্রকৃতির এক অন্যরকম উৎসব চলছে। পলিমাটি সমৃদ্ধ চরভরাটি জমিতে এবার কেওড়ার বাম্পার ফলন হয়েছে, যা উপকূলের সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। নদীর তীরবর্তী লবণাক্ত ভূমি ও চরাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে এবং সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে গড়ে ওঠা কেওড়া গাছগুলো এখন থোকায় থোকায় ফলে ভারী হয়ে উঠেছে। একসময়ের অবহেলিত এই বুনো ফলটি আজ খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের উপকূলবাসীর জন্য খাদ্য নিরাপত্তা ও অতিরিক্ত আয়ের এক শক্তিশালী উৎসে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা জেলার পাইকগাছা ও কয়রা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি কিংবা বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলার মতো উপকূলীয় জনপদের জীবনপ্রবাহ সবসময়ই নদী ও প্রকৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

শিবসা, ভদ্রা, মিনহাজ, কপিলিয়া ও কপোতাক্ষ নদের চরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, নদী ভাঙন রোধ এবং পরিবেশ রক্ষার্থে বিগত বছরগুলোতে যে কেওড়ার চারা রোপণ করা হয়েছিল, তা আজ মহীরুহে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে পাইকগাছা উপজেলার বাতিখালি, হাড়িয়া, বেতবুনিয়া, জিরবুনিয়া, কাঠামারী ও দেলুটীর নদীর চরে প্রায় একশ হেক্টর জমিতে যে বনায়ন গড়ে উঠেছে, তার প্রায় ৮০ শতাংশ জুড়েই রয়েছে কেওড়া গাছ।

প্রকৃতির নিয়মেই এই গাছগুলো লবণাক্ত মাটিতে টিকে থাকতে পারে এবং জোয়ার-ভাটার আঘাত সহ্য করে নিজের শেকড় শক্ত করে। ফাগুনের শেষ দিকে যখন কেওড়া গাছে নতুন ফুল ফোটে, তখন চারপাশ মৌমাছির গুঞ্জনে মুখরিত হয়ে ওঠে। এরপর চৈত্র মাস থেকেই শুরু হয় ফল ধরার পালা, যা গড়িয়ে চলে বর্ষার শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ ভাদ্র-আশ্বিন মাস পর্যন্ত। এই দীর্ঘ মওসুমে উপকূলের মানুষ প্রকৃতির এই দানকে পরম যতেœ গ্রহণ করে আসছে।

উপকূলীয় এলাকার মানুষের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যতালিকায় কেওড়ার রয়েছে এক বিশেষ ও অনন্য স্থান। টক স্বাদের এই ফলটি জিভে জল আনা নানা পদের রান্নার মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে ছোট চিংড়ি মাছের সঙ্গে কেওড়া অথবা মসুর ডালের টক ডালÑএসব পদের সুবাসে উপকূলের প্রতিটি গ্রামীণ ঘর মুখরিত থাকে। শুধু তরকারি বা ডালই নয়, কেওড়া দিয়ে তৈরি আচার, চাটনি, জ্যাম ও জেলি এখানকার মানুষের কাছে দারুণ জনপ্রিয়।

গ্রামের বধূরা ও গৃহিণীরা মওসুমের সময় গাছ থেকে কেওড়া সংগ্রহ করে বাড়িতেই ঐতিহ্যগত উপায়ে নানা মুখরোচক খাবার তৈরি করেন। বৈচিত্র্যময় এই স্বাদ কেবল পারিবারিক খাবারের টেবিলকেই সমৃদ্ধ করছে না, বরং অতিথি আপ্যায়ন কিংবা দূরদূরান্ত থেকে আসা ভ্রমণপিপাসুদের কাছেও এটি দারুণ আকর্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছে।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও কেওড়া এখন উপকূলের মানুষের জন্য বড় এক স্বস্তির নাম। স্থানীয় বাজারগুলোতে মওসুমে প্রতি কেজি কেওড়া ১০ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি হয়। দাম আপাতদৃষ্টিতে কম মনে হলেও, এই ফল সংগ্রহ ও বিক্রির কাজটি নদী তীরবর্তী দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য বাড়তি উপার্জনের পথ খুলে দিয়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা প্রতিদিন সকালে নদীর চরে গিয়ে কেওড়া সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে নিজেদের পকেট খরচ বা ছোটখাটো পারিবারিক চাহিদা মেটাচ্ছে।

বাতিখালি চর বনায়ন সমিতির সাধারণ সম্পাদক জামিরুল ইসলাম বলেন, "অনাবাদি ও লবণাক্ত জমিতে পরিকল্পিতভাবে কেওড়ার বনায়ন করা গেলে একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা এবং মানুষের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।" তার এই বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা মেলে স্থানীয় হাটবাজারগুলোতে, যেখানে কেওড়ার মওসুমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক অদৃশ্য গতির সঞ্চার হয়।

কেওড়া গাছের গুরুত্ব কেবল ফল সংগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সুন্দরবনের বিখ্যাত মধু উৎপাদনের সঙ্গেও এর রয়েছে গভীর যোগসূত্র। বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে যখন সুন্দরবনের কেওড়া গাছগুলোতে থোকায় থোকায় ফুল ফোটে, তখন মৌচাষিরা তাদের বাক্সে কিংবা বনের নির্দিষ্ট এলাকায় মৌমাছির সমাগম দেখতে পান। কেওড়া ফুল থেকে সংগৃহীত মধু অত্যন্ত সুস্বাদু ও গুণগত মানে সমৃদ্ধ হয়, যা সুন্দরবনের মধুর অন্যতম প্রধান উৎস।

পাশাপাশি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও কেওড়া অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। উপকূলীয় অঞ্চলের বেড়িবাঁধ ও চরাঞ্চলগুলোকে জলোচ্ছ্বাস, সাইক্লোন কিংবা নদী ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে এই গাছ প্রাকৃতিক প্রাচীর হিসেবে কাজ করে। এর শ্বাসমূল জোয়ার-ভাটার তীব্র স্রোতকে প্রতিহত করে মাটির ক্ষয় রোধ করে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় উপকূলের রক্ষাকবচ হিসেবে কেওড়া বনায়নের গুরুত্ব অপরিসীম।

বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় বন কর্মকর্তাদের মতে, কেওড়া ফলকে কেবল মওসুমি ও কাঁচা অবস্থায় বিক্রি না করে যদি একে বাণিজ্যিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করার ব্যবস্থা করা যায়, তবে উপকূলীয় অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটে যেতে পারে। কেওড়ার আচার, চাটনি ও জেলি দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও রফতানি করার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারী উদ্যোগে স্থানীয় নারী উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং কোল্ড স্টোরেজ বা সংরক্ষণের আধুনিক সুবিধা নিশ্চিত করা।

পাইকগাছা বন কর্মকর্তা প্রবীর বিশ্বাস মনে করেন, পরিকল্পিত বনায়নের মাধ্যমে কেওড়ার বিস্তার ঘটানো গেলে একদিকে যেমন উপকূলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের বাড়তি আয়ের স্থায়ী পথও তৈরি হবে। তিনি বলেন, "কেওড়া ফলকে ঘিরে উপকূলীয় অঞ্চলে অচিরেই একটি সম্ভাবনাময় ক্ষুদ্র শিল্পখাত গড়ে উঠতে পারে, যা বেকারত্ব দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।"

আজ যখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিজমিগুলো ক্রমান্বয়ে লবণাক্ততার গ্রাসে পড়ে অনাবাদি হয়ে পড়ছে, তখন কেওড়ার মতো লবণাক্ততা সহিষ্ণু উদ্ভিদ প্রকৃতির আশীর্বাদ হিসেবে হাজির হয়েছে। যে জমিগুলোতে ধান বা অন্য কোনো ফসল ফলানো সম্ভব নয়, সেই চরাঞ্চলগুলো আজ কেওড়ার সবুজ বনায়নে ছেয়ে গেছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারের পক্ষ থেকে যদি এই চরভরাটি জমিতে কেওড়া বনায়নের পরিধি আরও বাড়ানো হয় এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হয়, তবে এই অঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে আরও বেশি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে। নদী ভাঙনকবলিত মানুষের চোখে আজ নতুন আশার আলো জ্বেলেছে এই কেওড়া ফল। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা উপকূলের মানুষগুলোর মুখে হাসি ফুটিয়ে কেওড়া আজ কেবল একটি গাছ বা ফল নয়, বরং তাদের সাবলম্বী হয়ে ওঠার এক সুদৃঢ় মাধ্যম।