এস, এম মোস্তাফিজুর রহমান : “বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল বহুদিন ধরেই জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তবে সেই ঝুঁকির সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা দেখা যায় সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলায়। দুর্বল ও ভাঙনপ্রবণ বেড়িবাঁধ, নদীভাঙন এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এখানকার মানুষের জীবনে এক ভয়াবহ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হলেও এখনো এর স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে আশাশুনি উপজেলার মানুষ প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অব্যবস্থাপনার দ্বৈত আঘাত সহ্য করে চলেছে।

আশাশুনি উপজেলার প্রধান সংকটগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী বেড়িবাঁধের নাজুক অবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং অনেক ক্ষেত্রে অনিয়মের কারণে এসব বেড়িবাঁধ দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে সামান্য জোয়ার বা দুর্যোগেই বাঁধ ভেঙে জনপদ প্লাবিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল ও জুলাই মাসে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে যে উপকূলীয় অবকাঠামো এখনো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

বাঁধ ভেঙে জোয়ারের লবণাক্ত পানি প্রবেশ করলে আশাশুনির বিস্তীর্ণ এলাকা দীর্ঘ সময় পানির নিচে ডুবে থাকে। বিশেষ করে উপজেলার প্রতাপনগর,আনুলিয়া এবং খাজরা ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ বছরের পর বছর জলাবদ্ধতার মধ্যে জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। পানিবন্দি অবস্থায় তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হয়। লবণাক্ত পানির কারণে ফসলি জমি নষ্ট হয়ে যায়,পুকুর ও ঘেরের মাছ মারা যায়,আর কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। ফলে বহু মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন। এতে শুধু একটি অঞ্চলের অর্থনীতি নয়,সামাজিক কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুর্যোগ-পরবর্তী পুনঃগঠন কার্যক্রমের দুর্বলতা। অনেক সময় দেখা যায়,বাঁধ বা রাস্তা মেরামতের কাজ দ্রুত করা হলেও তা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী নয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই সেগুলো আবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবও বারবার প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এ কারণে জনগণের দুর্ভোগ কমার পরিবর্তে বরং দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠছে।

তবে আশার কথা হলো,এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আশাশুনির মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ (Friendship) উপকূলীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে খোলপেটুয়া নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর তারা প্লাবিত এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করে এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ভাসমান টয়লেট স্থাপন করে জরুরি সহায়তা প্রদান করে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলতে ১০টি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হরে। উপকূলীয় বনাঞ্চল সুরক্ষায় ম্যানগ্রোভ গাছ রোপণের উদ্যোগও তাদের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের একটি,যা ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করতে পারে।

স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা উত্তরণ (Uttaran) দীর্ঘদিন ধরে সাতক্ষীরার জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে কাজ করছে। তারা ‘টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট’ বা টিআরএম প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য জনমত তৈরি ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে। একই সঙ্গে ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’-এর সঙ্গে যৌথভাবে উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করছে।

এছাড়া লিডার্স (LEDARS) সংস্থাটি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি বা ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বিষয়ে কাজ করছে। তারা আশাশুনিতে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতায়ন এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে প্রশিক্ষণ প্রদান করছে,যাতে লবণাক্ততার কারণে কৃষি হারানো মানুষ নতুনভাবে জীবিকা খুঁজে নিতে পারে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, কারিতাস,সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন এবং সাজিদাহ ফাউন্ডেশন-এর মতো সংগঠনগুলোও বিভিন্নভাবে উপকূলবাসীর পাশে রয়েছে। কেউ জরুরি ত্রাণ সহায়তা প্রদান করছে, কেউ টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবিতে জনমত গড়ে তুলছে,আবার কেউ লবণাক্ততা-সহিষ্ণু ফসল চাষ বা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মতো টেকসই কৃষি মডেল নিয়ে কাজ করছে। একই সঙ্গে ব্র্যাক ও ইসলামিক রিলিফ দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু অভিযোজন ও কৃষি সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

তবে এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও বাস্তবতা হলো, আশাশুনির সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনো অধরা। এজন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। উপকূলীয় বেড়িবাঁধগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে পুনঃর্নিমাণ করতে হবে। নদী ব্যবস্থাপনা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা,জবাবদিহিতা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।

আশাশুনির মানুষের সংগ্রাম আসলে জলবায়ু পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। তারা বারবার দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েও টিকে থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই সংগ্রামকে একা তাদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। উপকূল রক্ষায় এবং মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় এখনই টেকসই ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় আশাশুনির এই আর্তনাদ একদিন পুরো উপকূলের ভবিষ্যতের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।”