জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাফিতি মুছে ফেলা, শিক্ষার্থীদের পুনরায় গ্রাফিতি আঁকতে বাধা, নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি এবং ১৪৪ ধারা জারিকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), সাধারণ শিক্ষার্থী এবং জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীরা এই ঘটনাকে শুধু একটি গ্রাফিতি অপসারণের ঘটনা নয়, বরং জুলাইয়ের চেতনা মুছে ফেলার অপচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও পুলিশ প্রশাসন বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নগর সৌন্দর্যবর্ধনের স্বার্থেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
গতকাল সোমবার বিকেলে নগরের ষোলোশহরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) চট্টগ্রাম মহানগরের উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলটির সদস্য সচিব আরিফ মঈনুদ্দীন অভিযোগ করেন, গ্রাফিতি অঙ্কনের সময় পুলিশ জুলাইয়ের সম্মুখসারির নারী যোদ্ধাদের গায়ে হাত দিয়েছে। তিনি বলেন, “নারী শিক্ষার্থীদের গায়ে হাত দিলে কী হয়, পুলিশ জুলাই থেকে শিক্ষা নেয়নি। জুলাই আন্দোলনের সময়ও একইভাবে দমন-পীড়নের চেষ্টা হয়েছিল। আজ আবার সেই পুরোনো আচরণ ফিরে এসেছে।”
গ্রাফিতি মুছে ফেলা নিয়ে ক্ষোভ : এনসিপির অভিযোগ, চট্টগ্রাম নগরের টাইগারপাস থেকে লালখানবাজার পর্যন্ত শহীদ ওয়াসিম আকরাম উড়ালসড়কের পিলারগুলোতে আঁকা জুলাই আন্দোলনের স্মারক গ্রাফিতি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের নির্দেশে মুছে ফেলা হয়েছে। শুধু মুছেই ক্ষান্ত হয়নি চসিক, সেখানে বিজ্ঞাপন ভাড়ার জন্য সাইনবোর্ডও টাঙানো হয়েছে। এনসিপির মহানগর আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, “এগুলো কেবল দেয়ালচিত্র নয়, এগুলো আন্দোলনের ইতিহাস, শহীদের স্মৃতি, নতুন প্রজন্মের প্রতিরোধের ভাষা। এগুলো মুছে ফেলা মানে ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা।”তিনি বলেন, ইস্পাহানি মোড় থেকে টাইগারপাস পর্যন্ত পুরো এলাকা বিজ্ঞাপনের জন্য ‘রেস্ট্রিকটেড’ করে ফেলা হয়েছে, যা জনগণের আবেগের জায়গায় বাণিজ্যিক আগ্রাসন।
শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ : রোববার সন্ধ্যায় এনসিপির পক্ষ থেকে ‘জুলাই গ্রাফিতি অঙ্কন’ কর্মসূচি পালন করা হয়। পরে সোমবার দুপুরে স্কুল-কলেজের পোশাক পরা ১৫ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী টাইগারপাস মোড়ে রং-তুলি নিয়ে জড়ো হন। তারা নিজেদের ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ ও ‘জুলাইযোদ্ধা’ পরিচয় দিয়ে পুনরায় গ্রাফিতি আঁকার চেষ্টা করেন। শিক্ষার্থীরা জানান, তারা কোনো রাজনৈতিক দলের ডাকে নয়, বিবেকের তাড়না থেকে এসেছেন। একজন শিক্ষার্থী বলেন, “জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি মুছে ফেলার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মন থেকে আন্দোলনের স্মৃতি মুছে ফেলার অপচেষ্টা চলছে। আমরা ঘরে বসে থাকতে পারি না।”আরেকজন বলেন, “এটা এনসিপি বা ছাত্রদলের কর্মসূচি নয়। এটা আমাদের ইতিহাস রক্ষার লড়াই।”
পুলিশি বাধা ও নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি : শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, গ্রাফিতি আঁকার সময় পুলিশ তাদের বাধা দেয়। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের পরিচয় জানতে গিয়ে মহিলা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। রঙের কৌটা নিয়ে টানাহেঁচড়ার সময় পুলিশ সদস্য ও শিক্ষার্থীদের গায়ে রং ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে আটক করা হলেও পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় এনসিপি ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। আরিফ মঈনুদ্দীন বলেন, “জুলাই আন্দোলনের মেয়েরা রাজপথে লড়েছে। আজ তাদের গায়ে হাত দেওয়া মানে সেই আত্মত্যাগকে অপমান করা।”
পুলিশের বক্তব্য : নগর পুলিশের (দক্ষিণ) উপ-পুলিশ কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূইয়া বলেন, জিইসি মোড় থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি থাকায় ওই এলাকায় কোনো ধরনের জমায়েতের অনুমতি ছিল না। তিনি বলেন, “কয়েকজন শিক্ষার্থী গ্রাফিতি আঁকার চেষ্টা করে। মহিলা পুলিশ সদস্যরা পরিচয় জানতে গেলে পুলিশের দিকে রং ছুড়ে মারা হয়। কিছুটা কথা কাটাকাটি হয়েছে, তবে কোনো বড় ঘটনা ঘটেনি।”কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক মীর মোহাম্মদ সেলিমও বলেন, সামান্য ধস্তাধস্তি হয়েছে এবং পুলিশ সদস্যদের ওপর রং নিক্ষেপ করা হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ রং ছুড়ে মারেনি; কৌটা নিয়ে টানাটানির সময় রং পড়ে যায়।
১৪৪ ধারা জারি ও প্রত্যাহার : রোববার রাতের উত্তেজনার পর সোমবার সকালে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ জিইসি মোড় থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত প্রধান সড়ক ও আশপাশ এলাকায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ, মিছিল ও জনসমাগম নিষিদ্ধ করে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮-এর ৩০ ধারায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে সন্ধ্যা সাতটা থেকে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ১৪৪ ধারা মূলত তাদের।