মোঃ আল আমিন, মাধবদী (নরসিংদী) সংবাদদাতা: মৌসুমের শুরুতেই অপরিপক্ক ও স্বাদহীন লিচুতে সয়লাব হয়ে গেছে নরসিংদীর শিল্পাঞ্চল খ্যাত মাধবদী বাজারে।
বেশি লাভের আশায় বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা গাছ থেকে কাঁচা ও টক স্বাদের লিচু পেড়ে বাজারে বিক্রি করছেন। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, এসব লিচু খেয়ে শিশুদের বমি, পেটে ব্যথাসহ মারাত্মক হাইপোগ্লাইসেমিয়া ও খিঁচুনি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, মাধবদী পৌর শহরের পোস্ট অফিস মোড়, স্কুল মার্কেটের সামনে, বাসস্ট্যান্ড, মাধবদী বাজারের ফল পট্রি সহ আশপাশের বিভিন্ন হাট-বাজারে এখন কাঁচা ও আধা-পাকা লিচুর ছড়াছড়ি। বর্তমানে বাজারে প্রতি ১০০ পিস দেশি মোজাফ্ফর জাতের লিচু ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
পোস্ট অফিস মোড়ের এক লিচু বিক্রেতা জানান, বোম্বাই ও চায়না-থ্রি জাতের লিচু বাজারে আসতে আরও ১০ থেকে ১২ দিন সময় লাগবে। তাই বসে না থেকে গত এক সপ্তাহ ধরে তিনি আগাম জাতের মোজাফ্ফর লিচু বিক্রি করছেন।
বাজারে আসা অনেক ক্রেতাই লিচুর প্রকৃত স্বাদ না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মাধবদী স্কুল সুপার মার্কেটের সামনে লিচু কিনতে আসা নরসিংদী ইনডিপেন্ডেন্ট কলেজ শিক্ষার্থী ইকরা জাহান বলেন, “হালকা টক লাগলেও বান্ধবীদের সঙ্গে খাওয়ার জন্য প্রতি পিস তিন থেকে সাড়ে তিন টাকা দরে লিচু কিনেছি।”
মাধবদী বাজারের একজন পাইকারী লিচু বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, কিছু বাগান মালিক বেশি লাভ ও দ্রুত টাকা পাওয়ার আশায় অপরিপক্ব লিচু বিক্রি করছেন। এতে ক্রেতারা যেমন লিচুর প্রকৃত স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। তিনি বলেন, “আরও আট-দশ দিন পর বাজারে পাকা ও রসালো লিচু আসবে।”
অপরিপক্ক লিচুর ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে মাধবদী প্রাইম জেনারেল হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. রায়হান আমির বলেন, “খালি পেটে এসব কাঁচা লিচু খেলে শরীরের গ্লুকোজ তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে গুরুতর হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বমি, পেটে ব্যথা, এমনকি খিঁচুনি হওয়ার মতো ঝুঁকি রয়েছে।”
ড. রায়হান আমির আরো বলেন, “অপরিপক্ব যেকোনো ফলই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। সময়ের আগে ফল পাকাতে রাসায়নিক ব্যবহার করতে হয়। বিশেষ করে শিশুরা এসব ফল দেখে আকৃষ্ট হয় এবং অভিভাবকদের কিনতে বাধ্য করে।”
তিনি বলেন, “লিচু একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ফল। পরিপক্ব অবস্থায় এতে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেল থাকে। কিন্তু অপরিপক্ব অবস্থায় এবং রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। শিশুদের হার্ট, ফুসফুস ও পাকস্থলী পুরোপুরি পরিণত না হওয়ায় তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।”
এ বিষয়ে মাধবদী পৌরসভার বাজার পরিদর্শক চন্দন বাবু বলেন, “বাজারে আসা বেশিরভাগ লিচুই অপরিপক্ক। গ্রাহকদের প্রতি আমাদের আহ্বান, আপনারা এ লিচু কিনবেন না। একই সঙ্গে বিক্রেতাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যেন তারা অন্তত আরও এক সপ্তাহ পর পরিপক্ক লিচু বাজারে আনেন। আমরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছি। কোনো লিচুতে ক্ষতিকর কেমিক্যালের মিশ্রণ পাওয়া গেলে বিক্রেতার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিকের মাধবদী শাখার সভাপতি ও মাধবদী প্রেসক্লাবের সভাপতি মকবুল হোসেন বলেন- “বর্তমানে বাজারে ছোট ছোট বিভিন্ন সাইজের লিচু বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে। জ্যৈষ্ঠের আগে লিচু কল্পনাও করা যায় না। বাজারে যেসব লিচু বিক্রি হচ্ছে সেগুলোতে রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে। শিশুরা না বুঝেই অভিভাবকদের কাছে আবদার করে এসব লিচু খেতে চাইছে। অপরিপক্ব লিচু খাওয়ার কারণে তারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।” তিনি ও স্থানীয়রা এ বিষয়ে নরসিংদী কৃষি বিভাগ ও প্রশাসনের নজরদারি বৃদ্ধির জোর দাবি জানান।