মোঃ ফিরোজ আহমেদ, পাইকগাছা : দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদে কৃষকের সোনালি স্বপ্নে হানা দিয়েছে ‘লবণাক্ততা’ নামক এক ভয়ঙ্কর বিষ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধ আর নদীভাঙনের ফলে উপকূলের উর্বর পলিমাটি আজ নিঃস্বপ্রায়। নোনা পানির অব্যাহত আগ্রাসনে শুধু কৃষি আবাদই ব্যাহত হচ্ছে না, বরং হুমকির মুখে পড়েছে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং লাখ লাখ মানুষের বাস্তুভিটা।
লবণের দহনে পুড়ছে কৃষকের স্বপ্ন : একসময় যে জমিতে বছরে তিনবার ধান, তিল, সরিষা ও সবজির সমাহার থাকত, আজ সেই জমি লবণের চাদরে ঢাকা পড়ে অনাবাদি হয়ে পড়ে আছে। খুলনার বটিয়াঘাটা, পাইকগাছা, দাকোপ, কয়রা; সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি এবং বাগেরহাটের মংলা ও রামপালের মাঠগুলোতে এখন শুধুই ধূসর হাহাকার।
চাষিরা জানান, ইরি-বোরো মৌসুমে বাড়তি খরচ আর হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়েও চারা টেকানো যাচ্ছে না। লবণাক্ততার কারণে বীজ বপন করলে চারা গজাচ্ছে না, আর গজালেও তা ‘লবণের কাঁজে’ পুড়ে মরে যাচ্ছে। ফসল বাঁচাতে কৃষক কয়েক দফা রাসায়নিক সার ও ওষুধ ব্যবহার করতে গিয়ে স্বাভাবিকের চেয়ে দেড়গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন।
মৃত্তিকা ইনস্টিটিউটের উদ্বেগজনক তথ্য : খুলনা মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় নদ-নদীতে লবণাক্ততার মাত্রা এখন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। গত বছরের নমুনা পরীক্ষায় দেখা গেছে: বটিয়াঘাটার গাগড়ামারি নদী: ২৬ ডিএস/মি। মংলার পশুর নদী: ২৬.৮ ডিএস/মি। সাতক্ষীরার আশাশুনি: ২৮.৩ ডিএস/মি। (সাধারণত এই মাত্রা যে কোনো কাজে ব্যবহারের জন্য চরম অনুপযোগী) মাটির ক্ষেত্রেও চিত্রটি ভয়াবহ। বটিয়াঘাটার কৃষ্ণনগরে লবণের মাত্রা ৬.৫ ইসি:ডিএস/মি এবং পাইকগাছা ও বাগেরহাটের দ্বিগরাজে তা ১০.৫ ইসি:ডিএস/মি পর্যন্ত পৌঁছেছে। সংস্থার এক জরিপ বলছে, উপকূলের প্রায় ১২ লক্ষাধিক হেক্টর জমি বর্তমানে লবণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত।
বাস্তুচ্যুত হওয়ার পথে লাখো মানুষ : মৃত্তিকা বিভাগের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জি এম মোস্তাফিজুর রহমান জানান, লবণাক্ততা এভাবে বাড়তে থাকলে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি আয় বছরে অন্তত ২১ শতাংশ কমে যাবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এর প্রভাবে প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষিজমি চিরতরে চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে, যার ফলে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার কৃষক বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
কৃষিবিদ আব্দুল গফুর মনে করেন, আগামী এক যুগে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। তিনি বলেন, “বর্তমানে উপকূলের কৃষি জমির প্রায় ৮৮ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে লবণাক্ততায় আক্রান্ত। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা ছাড়া উপায় থাকবে না।”
বিপন্ন প্রকৃতি ও জনস্বাস্থ্য : লবণাক্ততার প্রভাব শুধু ফসলের মাঠেই সীমাবদ্ধ নেই। উপকূলের গাছপালা বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে, গবাদি পশুর খাদ্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এমনকি ভূ-গর্ভস্থ পানিতেও লবণের অনুপ্রবেশ ঘটায় সুপেয় পানির অভাবে মানুষ বাধ্য হয়ে লোনা পানি পান করছে, যা দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
সংকট উত্তরণের উপায় : বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিপর্যয় রোধে সরকারি সংস্থা, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় কৃষকদের সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে। উপকূলীয় বেড়িবাঁধ সংস্কার, লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাতের উদ্ভাবন এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে চাষাবাদ পদ্ধতি পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায়, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মানচিত্রের একটি বড় অংশ কৃষি মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে।