লালমোহন (ভোলা) সংবাদদাতা : বাংলার গ্রামীণ জীবনের এক প্রাচীন ও প্রাণবন্ত ঐতিহ্য ছিল সপ্তাহে এক বা দুই দিন বসা সাপ্তাহিক হাট। নির্দিষ্ট দিনে আশপাশের গ্রাম থেকে মানুষ দল বেঁধে এই হাটে আসত। কৃষক তার উৎপাদিত ধান, পাট, শাকসবজি, মাছ, দুধ কিংবা গবাদিপশু নিয়ে হাজির হতো। ক্রেতারা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নিত, আর বিক্রেতারা বিক্রি করত নিজেদের পণ্য। হাট ছিল শুধু কেনাবেচার স্থান নয়; এটি ছিল গ্রামীণ মানুষের মিলনমেলা, খবর আদান-প্রদানের কেন্দ্র এবং এক ধরনের সামাজিক উৎসব।
এক সময় হাটের দিনে গ্রামজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হতো। সকাল থেকেই বিভিন্ন পথ ধরে মানুষ হাটের দিকে রওনা দিত। কারও মাথায় সবজির ঝুড়ি, কারও হাতে হাঁস-মুরগি, আবার কেউ গরু বা ছাগল নিয়ে হাটে যেত। হাটে পৌঁছালে দেখা যেত সারি সারি দোকান—কাঁচাবাজার, মাছের বাজার, মসলার দোকান, কাপড়ের দোকান, মাটির তৈজসপত্র, বাঁশের তৈরি ঝুড়ি ও ডালা, লোহার সরঞ্জামসহ নানা পণ্যের সমারোহ।
হাটের একটি আলাদা আকর্ষণ ছিল ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা ও প্রদর্শনী। বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানির কেনভাচাররা মাইক হাতে কিংবা ছোট মঞ্চ বানিয়ে তাদের ওষুধের গুণাগুণ প্রচার করত। তারা নানা গল্প, কৌতুক কিংবা নাটকীয় ভঙ্গিতে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করত। অনেকে আবার হারবাল বা ভেষজ ওষুধের কার্যকারিতা দেখিয়ে বিক্রি করত। এসব দৃশ্য হাটকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলত।
তাছাড়া হাটে দেখা মিলত সাপুড়ে, বানরওয়ালা কিংবা তাবিজ-কবজ বিক্রেতাদের। সাপুড়ে বাঁশির সুরে ঝুড়ি থেকে সাপ বের করে দেখাত, আর চারপাশে জড়ো হতো কৌতূহলী মানুষ। কেউ তাবিজ-কবজ কিনত অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায়, আবার কেউ কিনত সৌভাগ্যের প্রত্যাশায়। হাটের কোণে কোণে বসত ভাপা পিঠা, জিলাপি, মুড়ি-মুড়কি ও বিভিন্ন মিষ্টির দোকান। শিশু-কিশোরদের কাছে এসব দোকান ছিল বড় আনন্দের বিষয়।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামগঞ্জে এই সাপ্তাহিক হাট প্রথা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, গ্রামে স্থায়ী বাজার ও দোকানের সংখ্যা বৃদ্ধি, শহরের বাজারে সহজ যাতায়াত এবং আধুনিক ব্যবসা ব্যবস্থার প্রসারের ফলে মানুষ এখন প্রতিদিনই বাজার করতে পারছে। ফলে নির্দিষ্ট দিনে হাটে যাওয়ার আগ্রহ ও প্রয়োজনীয়তা আগের মতো আর নেই।
এর ফলে অনেক হাট আজ আগের সেই কোলাহল ও প্রাণচাঞ্চল্য হারিয়ে ফেলেছে। কোথাও কোথাও হাট বসার সংখ্যা কমে গেছে, আবার অনেক জায়গায় হাট পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এতে ছোট কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতারা তাদের গুরুত্বপূর্ণ বিক্রয়কেন্দ্র হারাচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ মানুষের সামাজিক মিলনস্থলও ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
তবুও সাপ্তাহিক হাটের গুরুত্ব সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়নি। এখনো অনেক গ্রামীণ এলাকায় এটি স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই গ্রামীণ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য এসব হাটকে টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
গ্রামবাংলার সাপ্তাহিক হাট কেবল একটি বাজার নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতি, স্মৃতি ও সামাজিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। এই ঐতিহ্য হারিয়ে গেলে গ্রামীণ জীবনের একটি প্রাণবন্ত অধ্যায়ও ধীরে ধীরে ইতিহাসের পাতায় স্থান নেবে।