প্রতি বছরের মতো এবারও খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার গরুর খামারিদের ব্যস্ততা বেড়েছে। কুরবানির হাটে ভালো দাম পেতে প্রস্তুত করা হচ্ছে বিভিন্ন জাতের গরু। নিরাপদ গোশত উৎপাদনের জন্য দেশীয় পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজা করছেন খামারিরা।
ডুমুরিয়া উপজেলার ১৪ টি ইউনিয়নে খামারিরা কুরবানির হাটে ভালো দাম পাওয়ার আশায় এখন গরু পালনে ব্যস্ত হাজারো খামারি। এসব খামারে সিদ্ধি, পাকিস্তানি, অস্ট্রেশিয়ানসহ দেশীয় বিলিন্ন জাতের গরু মোটাতাজা করা হচ্ছে।
ডুমুরিয়া উপজেলার রঘুনাথপুর ইউনিয়ানের রঘুনাথপুর গ্রামের মিনু নাহার ৫ বছরের হাট কাঁপানো ১০০০ কেজি ৪০ মণের একটি গরু ৫ বছর বয়স, দাম চেয়েছিলেন ১৪ লক্ষ টাকা থেকে ১২ লক্ষ টাকা হলে বিক্রয় করবেন। গরুর নাম রাজা মানিক রেখেছেন সে গরুকে এমন শিক্ষা দিয়েছেন গরুকে যা বলে গরু তার কথা সব শোনে। এলাকার বেশ কিছু গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি খামারে ৩-৬ জন লোক নিয়মিত গরু পরিচর্যা করছেন।
তবে ডুমুরিয়া উপজেলার প্রণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে এর চিত্র একটু আলাদা। তারা জানান, উপজেলার ১৪ টি ইউনিয়নে ৯ হাজার ৫৯৮ জন পারিবারিক ও বাণিজ্যিকভাবে খামারে গবাদিপশু পালন করছেন। আর এ থেকে ৫১ টি খামারে ৪৫ হাজার ৮৩৬ টি গবাদিপশু উৎপাদিত হবে। যা চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত। এবারও উপজেলা প্রশাসন অনুমোদিত ১৪ টি ইউনিয়নে স্থায়ী এবং অস্থায়ীভাবে বসছে ৩টি পশুর হাট। তবে হাটগুলোতে বিশেষ তদারকি করবেন এখন ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম।
খামারি মিনু সাহা বলেন, এ বছর কুরবানিতে গরুর চাহিদা অনেক তবে গো-খাদ্যের দাম বেশি। তারপরেও আগের মতো গরুকে মোটাজাতা করণে খাদ্য দিয়ে থাকেন। দৈনিক একটি গরুর পিছনে ৯৮ টাকা মতো খাদ্যে খরচ হয়। বিক্রি যোগ্য এবারের প্রতিটি গরুর মূল্য প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১৬ লক্ষ টাকা।
তিনি আরো বলেন, বর্তমানে ৪টা দেশি ও অস্ট্রেলিয়ার জাতের গরু রয়েছে। এখনো যার আনুমানিক বাজার মূল্য ৪/৫শ লক্ষ টাকা, বিগত বছর লোকসান হওয়াতে এবারও ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবেন কিনা তা নিয়ে দুঃচিন্তায় খামারি। অন্যদিকে গরুর খামারি আমির হামজা বলেন, কিছুদিন আগে ৮টি গরু বিক্রি করে বর্তমানে ৫ টি গরু রয়েছে তার খামারে। এবার কুরবানিতে ৫০ হাজার টাকার মূল্যের ৩ টি গরুর বিক্রি করবেন। খর্ণিয়ার জুয়েল, জামালসহ আরো অনেকে জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর গরুর দাম দুই-তিন গুণ বেশী চাচ্ছেন বিক্রেতারা।
বিক্রেতা নজরুলসহ অনেকেই বলছেন, গো-খাদ্যের দাম বেশি থাকায় গরু লালন-পালনে তাদের খরচ বেশি হয়েছে। তাই গরুর দামও একটু বেশি।
ডুমুরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. মো. আশরাফুল কবির বলেন, ব্যাপারিদের ও কৃষকদের উৎসাহ দিতে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় প্রাণী সম্পদ অফিস। অন্যদিকে গত বছর বে-সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিবার উন্নয়ন সংস্থা (এফডিএ) এর আরএমটিপি প্রকল্প আওতায় দেশীয় পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজা করতে ৪৯জন খামারিতে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে। এতে করে দিন দিন গরু পালন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক সময় অবাধু কিছু ব্যবসায়ী গরু মোটাতাজা করতে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর স্ট্রয়েড ও হরমোন জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করতো। ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার করে পশু মোটাতাজাকরণের প্রবণতা এখন আর নেই বললেই চলে। তারপরেও ডুমুরিয়ায় ৫ জন করে ও টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম খামারে গিয়ে অবৈধভাবে গরু মোটাতাজাকরণ হচ্ছে কি না, তা মনিটরিং করেছেন।
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিজ সবিতা সরকার বলেন, ‘রাজা মানিক’ পালনের মাধ্যমে এই খামারি যে সাফল্য দেখিয়েছেন তা আমাদের উপজেলার জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্পে কোনো ধরনের ক্ষতিকর স্টেরয়েড বা রাসায়নিক ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে পশু পালন করা হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের লক্ষ্য হলো ডুমুরিয়ার শিক্ষিত বেকার যুবকদের এ ধরনের কৃষিভিত্তিক ও প্রাণিসম্পদ খাতের উদ্যোগে সম্পৃক্ত করা। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ এবং সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি। আশা করি, তার এই সাফল্য দেখে আরও অনেকে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে গরু পালনে এগিয়ে আসবেন এবং নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করবেন।"