পবিত্র রমযানকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুসলমানের জন্য ঢালস্বরূপ দিয়েছেন। এ রমযানে মুসলমানদেরকে আল্লাহ রোজার মাধ্যমে গুনাহ ও পাপাচার থেকে রক্ষা করে থাকেন। রোজা পালন অবস্থায় গীবত করা যাবে না, মিথ্যা কথা বলা ও চোগলখুরী করা যাবে না, পরনিন্দা করা যাবে না। এসব কাজসহ সকল প্রকার অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকলেই রোযা ঢাল হিসেবে ব্যবহার হবে। যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর আক্রমন থেকে রক্ষার জন্য লোহার তৈরি ঢাল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ঠিক তেমনি মোমিন বান্দা শয়তানের আক্রমন থেকে রক্ষার জন্য আল্লাহ পবিত্র রোজাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ দিয়েছেন। এখন যদি কেউ এ ঢালের রক্ষণাবেক্ষণ না করতে পারে তাহলে আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবে কিভাবে।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “আসসাওমু যুন্নাতুন” রোজা ঢাল স্বরূপ; যদি না সে নিজেই তা ছিদ্র করে দেয়। সাহাবাগণ (রাঃ) আরজ করলেন, হে আল্লাহ রাসুল (সাঃ) কোন জিনিস দ্বারা রোজা ছিদ্র হয়ে যায়? উত্তরে তিনি বললেন, মিথ্যা কথা ও গীবত দ্বারা।” এতে বোঝা যাচ্ছে যে, রোজা অবস্থায় গীবত, শেকায়েত, পরনিন্দা, চোগলখুরী ও মিথ্যা বলার বদ অভ্যাস পরিত্যাগ করা বিশেষভাবে অপরিহার্য, অন্যথায় রোজা কার্যকরী হবে না। প্রকাশ্যে রোজা রাখা হয়েছে বলা হলেও আল্লাহর কাছে এ রোজা গ্রহণযোগ্য হবে না।
পবিত্র রমযানে শয়তানের প্ররোচনা কম থাকে। ফলে এ মাসে বেশী বেশী ইবাদাত বন্দেগী করার সুযোগ থাকে। আর এ মাসে ইবাদাত বন্দেগীতেও বেশী পরিমাণ সওয়াবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত রাসূলে করীম (সা.) বলেছেন- রমযান মাসের প্রথম রাত্রি উপস্থিত হলেই শয়তান ও দুষ্টতম জ্বিনগুলোকে রশি দিয়ে বেঁধে ফেলা হয় এবং জাহান্নামের দুয়ারগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। অতঃপর এর একটি দরজাও খোলা হয় না এবং বেহেশতের দরজাগুলি খুলে দেয়া হয় অতঃপর এর একটি দরজা ও বন্ধ করা হয় না। আর একজন ঘোষণাকারী ডেকে ডেকে বলতে থাকে “হে! কল্যাণের প্রত্যাশী, অগ্রসর হও এবং হে! খারাপের পোষণকারী! বিরত হও, পশ্চাদপসরণ কর। আর আল্লাহর জন্য দোযখ থেকে মুক্তি পাওয়া বহুলোক রয়েছে। এইভাবে (রমযানের) প্রত্যেক রাতেই করা হয়। (তিরমিযী)।
রোজা মানব হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, ভক্তি ও তাক্ওয়ার মান বাড়াতে লবণ সাদৃশ্য, রোজা রোজাদারের যাবতীয় পাপ মোচন করে জান্নাত লাভের নিশ্চয়তা প্রদান করে। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, হযরত নবী করীম (সঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি বিশ্বাসের আন্তরিকতার ও উত্তম ফল লাভের বাসনায় রমযান মাসে রোজা রাখে, তার আগের সর্বপ্রকার পাপ ক্ষমা করা হবে। (বোখারী, মুসলিম)
হাদীস হতে জানা যায় যে, ‘রোজা ধৈর্যের অর্ধেক আর ধৈর্য্য ঈমানের অর্ধেক’। ইসলামী পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে রমযানের রোজা স্রষ্টার সাথে বান্দার সাক্ষাৎ লাভের মাধ্যম হিসেবে সর্বশ্রেষ্ঠ স্তম্ভ। আর এজন্যই রাসূলে করীম (সঃ) হাদীসে কুদসীর মাধ্যমে এরশাদ করেছেন, সম্মান ও মর্যাদার প্রভু আল্লাহ্ বলেন, ‘মানুষের অন্য সব কাজ তার নিজের জন্য, কিন্তু রোযা একান্তই আমার জন্য এবং আমি এর জন্য তাকে পুরস্কৃত করব’, রোজা ঢাল স্বরূপ। তাঁর নামে বলছি যার হাতে মুহাম্মদের জীবন, রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহ্র নিকট মেশকের গন্ধের চেয়েও পবিত্র। একজন রোজাদার দু’টি আনন্দ লাভ করে, সে আনন্দিত হয় যখন সে ইফতার করে এবং রোজার কল্যাণে সে আনন্দিত হয় যখন সে তার প্রভূর সাথে মিলিত হয়। (বুখারী)
কুরআন শরীফ হতে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ্তা’আলা ধৈর্যশীলদেরকে বেহিসাব সওয়াব দান করবেন। রোজা পালন করার ফলে রোজাদার ধৈর্যের চূড়ান্ত নমুনা পেশ করেন, হাদীসে কুদসী হতে জানা যায় যে, রসূলে পাক (সঃ) বলেছেন, আল্লাহ্ বলেন যে, রোজাদার তার ভোগ লিপ্সা এবং পানাহার শুধুমাত্র আমার জন্যই বর্জন করে; সুতরাং রোজা আমার উদ্দেশ্যে আমিই এর প্রতিদান (মুসলিম)।
ইমাম গায্যালী (রহঃ) পবিত্র রমযানে রোজার হকীকত ব্যক্ত করতে যেয়ে বলেন, “আল্লাহ্ তা’আলা রোজাদার ইবাদতে মশগুল যুবক দ্বারা ফিরিশতাদের কাছে বড়াই করেন; আর বলেন, হে আমার জন্য কামনা বাসনা দমনকারী যুবক! হে আমার সন্তুষ্টির লক্ষ্যে যৌবন অতিবাহিতকারী যুবক! কোন ফিরিশতার চেয়ে তুমি আমার নিকট কম নও। হে ফিরিশতা মন্ডলী! তোমরা আমার যুবক বান্দার প্রতি লক্ষ্য কর, সে তার কাম প্রবৃত্তি তার ক্রোধ, তার মুখ, তার পানাহার শুধুমাত্র আমারই সন্তুষ্টির লক্ষ্যে বর্জন করেছে।” (এহ্ ইয়া উলুমিদ্দীন)
হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, রসূলে করীম (সঃ) বলেছেন, “শয়তান মানুষের ধমনীতে চলাচল করে, তোমরা যদি শয়তান হতে আত্মরক্ষা করতে চাও তবে রোজার মাধ্যমে তোমাদের ধমনীকে সংকীর্ণ করে দাও। রাবী আরো বলেন, একবার হুযূর (সঃ) আমাকে বললেন, হে আয়শা! সদাসর্বদা জান্নাতের দরজার কড়া নাড়তে থাক। জিজ্ঞাসা করলাম হে আল্লাহ্র রসূল (সঃ) তা কিভাবে? তিনি (সঃ) উত্তর দিলেন, রোজার মাধ্যমে”। (এহ্ ইয়াউ উলুমিদ্দীন)
হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে, রসূলে করীম (সঃ) বলেছেন, “যখন রমযান মাস আসে, তখন জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, আর শয়তানের পায়ে জিঞ্জির পরানো হয়”। (বুখারী)
প্রত্যেক রোজাদারকে গভীরভাবে মনে রাখতে হবে যে, রোজা আদায়ের অর্থ কতগুলো বিষয় থেকে বেঁচে থাকা ও কতগুলো বিষয়কে বর্জন করা। এর মাঝে বাহ্যিকতার কোন আমল নেই। অন্য যে কোন ইবাদত মানব দৃষ্টে ধরা পড়ে কিন্তু রোজা এমন এক ইবাদত যা শুধু আল্লাহ্ই দেখতে পান, যার মূল শিকড় রোজাদার ব্যক্তির হৃদয়ে লুকায়িত তাকওয়ার সাথে সংযুক্ত।
হাদীস হতে জানা যায় যে, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন, “মানুষের হৃদয়ে যদি শয়তানের আনাগোনা না থাকতো, তবে মানুষ ঊর্দ্ধজগত দেখার দৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে যেত। শয়তানের আনাগোনা বন্ধে রোজা হচ্ছে ইবাদত কর্মসমূহের ঢাল স্বরূপ”।